ভালোবাসা থেকে শিরক: শয়তানের চতুর পরিকল্পনা ও সৎ নিয়তের বিপদ


 
ভালোবাসা_থেকে_শিরক











ভালোবাসা থেকে শিরক: শয়তানের চতুর পরিকল্পনা ও সৎ নিয়তের বিপদ

ভূমিকা

মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসার অনুভূতি আল্লাহ তায়ালার এক অপূর্ব সৃষ্টি। পিতা-মাতা, সন্তান, স্বামী-স্ত্রী এবং পরিবার-পরিজনের প্রতি ভালোবাসা মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির অংশ। কিন্তু এই ভালোবাসাই যখন সীমা অতিক্রম করে যায়, যখন তা আল্লাহর ভালোবাসাকে ছাপিয়ে যায়, তখন তা শিরকের দিকে ধাবিত করে। শয়তান অত্যন্ত চতুরতার সাথে মানুষের এই স্বাভাবিক অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে তাকে তাওহীদ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

আজকের যুগে আমরা দেখি, অনেক মুসলমান সৎ নিয়তে, ভালোবাসার টানে এমন সব কাজ করে যা ধীরে ধীরে তাদেরকে শিরকের দিকে নিয়ে যায়। কবরে সেজদা, মাজারে মানত, মৃত বুজুর্গদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা - এসব কিছুই শুরু হয় ভালোবাসা এবং সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে। কিন্তু এর পরিণতি হয় অত্যন্ত ভয়াবহ।

এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব কীভাবে শয়তান ভালোবাসাকে হাতিয়ার বানিয়ে মানুষকে শিরকের দিকে ঠেলে দেয়, সৎ নিয়তের বিপদ কী এবং কীভাবে আমরা নিজেদের ঈমানকে রক্ষা করতে পারি।

ভালোবাসা: আল্লাহর দেওয়া এক মহান অনুভূতি

আল্লাহ তায়ালা মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসার অনুভূতি দিয়েছেন যাতে পরিবার, সমাজ এবং মানবতা একসাথে বসবাস করতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী, সন্তান এবং সাহাবীদের ভালোবাসতেন। তিনি বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।"

কিন্তু ইসলামে ভালোবাসার ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন:

"বলুন, তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যার মন্দা হওয়ার ভয় তোমরা কর এবং তোমাদের বাসস্থান যা তোমরা পছন্দ কর - যদি এসব তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর আল্লাহর নির্দেশ আসা পর্যন্ত।" (সূরা তাওবা: ২৪)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট যে, ভালোবাসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্থান হবে আল্লাহর। অন্য সকল ভালোবাসা হবে আল্লাহর ভালোবাসার অধীনে।

শয়তানের চতুর পরিকল্পনা: ভালোবাসা থেকে শিরক

শয়তান সরাসরি মানুষকে শিরক করতে বলে না। সে জানে যে, একজন মুসলমান কখনো প্রকাশ্যে শিরক করতে রাজি হবে না। তাই সে অত্যন্ত সূক্ষ্ম পথ বেছে নেয়। সে মানুষের ভালোবাসা এবং সম্মানবোধকে কাজে লাগায়।

প্রথম পদক্ষেপ: অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন

শয়তান প্রথমে মানুষকে নেক বান্দা, আউলিয়া এবং বুজুর্গদের প্রতি অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শনে উৎসাহিত করে। সে বলে, "এই মহান ব্যক্তিকে সম্মান করা তোমার ঈমানের লক্ষণ।" প্রথম দিকে এটা হয়তো সাধারণ সম্মান থেকে শুরু হয়, কিন্তু ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে।

দ্বিতীয় পদক্ষেপ: মাধ্যম তৈরি করা

এরপর শয়তান মানুষকে বোঝায় যে, "তুমি তো সরাসরি আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে পার না। তোমার পাপ অনেক। এই পুণ্যবান ব্যক্তিদের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে দোয়া করাও তো একটা উপায়।" এভাবে সে মানুষকে মাধ্যম তৈরি করতে শেখায়, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

তৃতীয় পদক্ষেপ: ধীরে ধীরে শিরকের দিকে

যখন মানুষ মাধ্যমে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন শয়তান তাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেয়। সে বলে, "এই মাজারে গেলে তোমার সমস্যার সমাধান হবে। এই পীরের কাছে মানত করলে তোমার মনোবাঞ্ছা পূরণ হবে।" এভাবে মানুষ শিরকে লিপ্ত হয়ে যায়, অথচ সে মনে করে সে ভালো কাজ করছে।

ইতিহাসে আমরা দেখি, নূহ আলাইহিস সালামের সময়ে শিরক এভাবেই শুরু হয়েছিল। তাঁর জাতির কিছু নেক মানুষ মারা যাওয়ার পর, শয়তান মানুষকে বলল তাদের স্মরণে মূর্তি বানাতে, যাতে তাদের দেখে নেক কাজে উদ্বুদ্ধ হওয়া যায়। ধীরে ধীরে পরবর্তী প্রজন্ম ভুলে গেল মূল উদ্দেশ্য এবং শুরু করল সেই মূর্তিগুলোর পূজা।

সৎ নিয়তের বিপদ: ভুল পথে সঠিক উদ্দেশ্য

অনেকে বলে, "আমার নিয়ত তো ভালো। আমি তো শুধু আল্লাহর জন্যই এটা করছি।" কিন্তু ইসলামে শুধু নিয়ত যথেষ্ট নয়। কাজটি অবশ্যই কুরআন এবং সুন্নাহ অনুযায়ী হতে হবে।

নিয়ত এবং আমলের সমন্বয়

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "প্রত্যেক আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।" কিন্তু তিনি এও বলেছেন, "যে ব্যক্তি এমন আমল করল যার ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।"

অর্থাৎ, ভালো নিয়ত থাকলেও যদি আমলটি শরীয়তসম্মত না হয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন, কেউ যদি ভালো নিয়তে কবরে সেজদা করে, সেটা কখনো জায়েজ হবে না, কারণ এটা শিরক।

ইবাদতে বিদআত

অনেকে বলে, "আমি তো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই নতুন পদ্ধতিতে ইবাদত করছি।" কিন্তু ইবাদতের ক্ষেত্রে নতুনত্ব আনা নিষেধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "দীনের মধ্যে প্রত্যেক নতুন বিষয় বিদআত, প্রত্যেক বিদআত পথভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক পথভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম।"

ইতিহাস থেকে শিক্ষা

খারেজী সম্প্রদায়ের কথা চিন্তা করুন। তারা অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ছিল, রাতভর নামাজ পড়ত, দিনভর রোজা রাখত। কিন্তু তাদের বুঝ ছিল ভুল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সম্পর্কে বলেছেন, "তারা কুরআন পড়বে কিন্তু তা তাদের গলা অতিক্রম করবে না।"

শিরকের প্রকারভেদ এবং ভালোবাসার সম্পর্ক

শিরক দুই প্রকার: শিরকে আকবর (বড় শিরক) এবং শিরকে আসগর (ছোট শিরক)।

শিরকে আকবর

শিরকে আকবর হলো আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ইবাদতে শরীক করা। যেমন, কবরবাসীকে ডাকা, মাজারে সাহায্য প্রার্থনা করা, গায়রুল্লাহর নামে মানত করা ইত্যাদি।

অনেকে ভালোবাসার কারণে এসব করে। তারা বলে, "আমরা তো এই পীরকে অনেক ভালোবাসি। তিনি আমাদের জন্য দোয়া করবেন।" কিন্তু মৃত ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়া স্পষ্ট শিরক। আল্লাহ বলেন:

"আল্লাহকে ছেড়ে যাদের তোমরা ডাক, তারা তোমাদের মতই বান্দা।" (সূরা আরাফ: ১৯৪)

শিরকে আসগর

শিরকে আসগর হলো লোক দেখানো আমল, আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে ভয় পাওয়া ইত্যাদি। ভালোবাসার কারণে অনেকে এতে লিপ্ত হয়। যেমন, কেউ যদি মানুষকে খুশি করার জন্য ইবাদত করে, অথবা কারও ভালোবাসা হারানোর ভয়ে আল্লাহর হুকুম ছেড়ে দেয়, এটাও এক ধরনের শিরক।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আমি তোমাদের জন্য শিরকে আসগর সম্পর্কে অত্যন্ত ভীত। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, শিরকে আসগর কী? তিনি বললেন, রিয়া বা লোক দেখানো আমল।"

ভালোবাসা এবং তাওহীদের ভারসাম্য

ইসলাম ভালোবাসাকে নিষেধ করে না, বরং সঠিক পথ দেখায়। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে হবে। তারপর আল্লাহর জন্য অন্যদের ভালোবাসতে হবে।

আল্লাহর ভালোবাসার মানদণ্ড

আল্লাহকে ভালোবাসার প্রমাণ হলো তাঁর আনুগত্য করা। আল্লাহ বলেন:

"বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।" (সূরা আলে ইমরান: ৩১)

রাসূলকে ভালোবাসার অর্থ তাঁর সুন্নাহ মেনে চলা, তাঁর নির্দেশিত পথে চলা। মাজারে গিয়ে, কবরে সেজদা করে রাসূলকে ভালোবাসা প্রমাণ হয় না।

সাহাবীদের ভালোবাসা

সাহাবীরা রাসূলকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। কিন্তু তারা কখনো তাঁর কবরকে সেজদাগাহ বানাননি। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবদ্দশায়ই সতর্ক করে গিয়েছিলেন:

"তোমরা আমার কবরকে উৎসবস্থলে পরিণত করো না এবং তোমাদের ঘরসমূহকে কবরস্থানে পরিণত করো না।"

তিনি আরও বলেছেন, "আল্লাহ ইহুদী ও খ্রিস্টানদের ধ্বংস করুন, তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়েছে।"

আধুনিক যুগে শিরকের নতুন রূপ

আজকের যুগে শয়তান নতুন নতুন পথে মানুষকে শিরকে লিপ্ত করছে। শুধু মাজার-কবরে সীমাবদ্ধ নয়, আধুনিক শিরক বিভিন্ন রূপে আত্মপ্রকাশ করছে।

জ্যোতিষশাস্ত্র এবং ভবিষ্যৎ গণনা

অনেক মুসলমান, এমনকি শিক্ষিতরাও, রাশিফল দেখে, জ্যোতিষীদের কাছে যায়। তারা ভাবে, "শুধু জেনে নিচ্ছি, এতে ক্ষতি কী?" কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

"যে ব্যক্তি গণকের কাছে গিয়ে তাকে কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করল এবং তাকে বিশ্বাস করল, তার চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল হবে না।"

তাবিজ-কবচ এবং ঝাড়ফুঁক

অনেকে সন্তানকে ভালোবাসার কারণে তাবিজ ঝুলিয়ে দেয়, ভাবে এতে সন্তান রক্ষা পাবে। কিন্তু এটা শিরক। আল্লাহই একমাত্র রক্ষাকর্তা। তাবিজকে রক্ষাকর্তা মনে করা আল্লাহর সাথে শিরক করার শামিল।

অবশ্য কুরআন-হাদীসের দোয়া দিয়ে ঝাড়ফুঁক করা জায়েজ, কিন্তু অর্থহীন শব্দ বা শিরকী বাক্য দিয়ে তাবিজ তৈরি করা হারাম।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শিরক

আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় "শেয়ার কর, তাহলে তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে" ধরনের পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। এটাও এক ধরনের শিরক, কারণ শেয়ার করাকে বরকতের উৎস মনে করা হচ্ছে।

তাওহীদের পথে ফিরে আসা

শিরক থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো তাওহীদকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা। তাওহীদ মানে হলো আল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় হিসেবে বিশ্বাস করা এবং সকল ইবাদত শুধুমাত্র তাঁর জন্য করা।

তাওহীদের তিন প্রকার

১. তাওহীদুর রুবুবিয়াহ: আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, রিজিকদাতা এবং পরিচালক - এই বিশ্বাস রাখা।

২. তাওহীদুল উলুহিয়াহ: সকল ইবাদত শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য করা। দোয়া, নামাজ, রোজা, সাহায্য প্রার্থনা - সবকিছু শুধু আল্লাহর কাছে।

৩. তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত: আল্লাহর নাম ও গুণাবলীতে বিশ্বাস রাখা, তাঁর সাথে কাউকে তুলনা না করা।

তাওবার গুরুত্ব

যদি কেউ অতীতে শিরকে লিপ্ত হয়ে থাকে, তাহলে তার জন্য তাওবার দরজা খোলা আছে। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি বলেন:

"বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেন।" (সূরা যুমার: ৫৩)

তাওবা করার জন্য তিনটি শর্ত: ১. পাপ ছেড়ে দেওয়া ২. অতীতের পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া ৩. ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা

বাস্তব জীবনে প্রয়োগ

পরিবারে তাওহীদ শিক্ষা

সন্তানদের ছোটবেলা থেকে তাওহীদ শেখানো অত্যন্ত জরুরি। তাদের শেখাতে হবে শুধু আল্লাহকে ভয় করতে, শুধু তাঁর কাছে চাইতে। যখন সন্তান কিছু চাইবে, তাকে বলতে হবে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে।

সঠিক আকীদার বই পড়া

তাওহীদ এবং শিরক সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। "কিতাবুত তাওহীদ" শায়খ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব রচিত একটি চমৎকার গ্রন্থ যা প্রত্যেক মুসলমানের পড়া উচিত।

সুসঙ্গ বাছাই

যারা তাওহীদের উপর অটল, যারা সুন্নাহ মেনে চলে, তাদের সাথে থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "মানুষ তার বন্ধুর দীনের উপর থাকে। সুতরাং তোমরা দেখে নাও কার সাথে বন্ধুত্ব করছ।"

বিদআত থেকে সুন্নাহর পার্থক্য

অনেকে মনে করে, যেকোনো ভালো কাজই ইবাদত। কিন্তু ইসলামে ইবাদত শুধু সেটাই যা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

বিদআতের পরিচয়

বিদআত হলো দীনের মধ্যে এমন কিছু যুক্ত করা যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেননি বা অনুমোদন করেননি। যেমন, মিলাদ-মাহফিল, শবে বরাত উদযাপন, নির্দিষ্ট কিছু রাতে বিশেষ নামাজ ইত্যাদি।

অনেকে বলে, "এতে তো ক্ষতি নেই, আমরা তো আল্লাহর জিকিরই করছি।" কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে আমাদের দীনে এমন কিছু নতুন করল যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।"

সুন্নাহর অনুসরণ

সুন্নাহ অনুসরণ মানে হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে ইবাদত করেছেন, সেভাবেই করা। আল্লাহ বলেন:

"রাসূল তোমাদের যা দিয়েছেন তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাক।" (সূরা হাশর: ৭)

উপসংহার

ভালোবাসা আল্লাহর দেওয়া এক মহান নেয়ামত। কিন্তু এই ভালোবাসাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা আমাদের দায়িত্ব। শয়তান সর্বদা চেষ্টা করে যাচ্ছে এই ভালোবাসাকে হাতিয়ার বানিয়ে আমাদের শিরকের দিকে ঠেলে দিতে। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং তাওহীদের উপর অটল থাকতে হবে।

মনে রাখবেন, সৎ নিয়ত যথেষ্ট নয় যদি আমল শরীয়তসম্মত না হয়। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশিত পথেই চলতে হবে। মাজার, কবর, তাবিজ-কবচ, জ্যোতিষশাস্ত্র - এসব থেকে দূরে থাকতে হবে। একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে, তাঁর কাছেই দোয়া করতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে তাওহীদের উপর অটল থাকার তাওফীক দান করুন। তিনি আমাদের শিরক এবং বিদআত থেকে রক্ষা করুন এবং সুন্নাহ মেনে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

১. মৃত বুজুর্গদের স্মরণ করা কি শিরক?

না, মৃত বুজুর্গদের স্মরণ করা এবং তাদের ভালো গুণাবলী থেকে শিক্ষা নেওয়া শিরক নয়। কিন্তু তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া, তাদের কবরে সেজদা করা, তাদের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে দোয়া করা - এগুলো শিরক। সাহাবীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং তাঁকে স্মরণ করতেন, কিন্তু তারা কখনো তাঁর কবরে গিয়ে সাহায্য চাননি।

২. কবর জিয়ারত করা কি জায়েজ?

হ্যাঁ, মৃত্যু স্মরণ এবং তাদের জন্য দোয়া করার উদ্দেশ্যে কবর জিয়ারত করা জায়েজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আমি তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা জিয়ারত করতে পার।" কিন্তু কবরবাসীকে ডাকা, তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া, কবরে সেজদা করা - এগুলো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং শিরক।

৩. নবী ও রাসূলদের ভালোবাসা কতটুকু হওয়া উচিত?

নবী-রাসূলদের, বিশেষত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসা ঈমানের অংশ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সকল মানুষ থেকে প্রিয় হব।" কিন্তু এই ভালোবাসার প্রকাশ হবে তাঁর সুন্নাহ মেনে চলার মাধ্যমে, তাঁকে ইবাদতের উপাস্য বানানোর মাধ্যমে নয়।

৪. তাবিজ-কবচ পরিধান করা কি সম্পূর্ণ হারাম?

কুরআনের আয়াত বা হাদীসের দোয়া ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে তৈরি তাবিজ পরিধান করা হারাম এবং শিরক। কারণ এটা আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর উপর নির্ভরতা। তবে কুরআনের আয়াত দিয়ে তাবিজ পরিধানের ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। কিন্তু সর্বোত্তম হলো তাবিজ না পরে সরাসরি কুরআনের আয়াত মুখস্থ করা এবং নিয়মিত পড়া।

৫. রিয়া বা লোক দেখানো আমল থেকে কীভাবে বাঁচা যায়?

রিয়া থেকে বাঁচার জন্য সর্বদা আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করতে হবে এবং ইখলাস বা একনিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। প্রতিটি আমলের আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন: "আমি কি এটা শুধু আল্লাহর জন্য করছি?" নফল ইবাদতগুলো গোপনে করার চেষ্টা করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "গোপন সদকা আল্লাহর ক্রোধ নিভিয়ে দেয়।"

৬. পিতা-মাতার আনুগত্য করতে গিয়ে যদি শিরক করতে বলে, তাহলে কী করব?

আল্লাহ তায়ালা পিতা-মাতার আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু শিরকের ক্ষেত্রে নয়। আল্লাহ বলেন: "আর যদি তারা (পিতা-মাতা) তোমাকে আমার সাথে শিরক করতে বাধ্য করে, যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তাদের আনুগত্য করো না। তবে দুনিয়ায় তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস কর।" (সূরা লুকমান: ১৫) সুতরাং শিরকের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার আনুগত্য করা যাবে না, তবে তাদের সাথে সম্মান ও ভালোবাসার সাথে কথা বলতে হবে।

৭. বিদআত এবং সুন্নাহর মধ্যে পার্থক্য কীভাবে বুঝব?

যেকোনো ইবাদত বা ধর্মীয় কাজের ক্ষেত্রে প্রশ্ন করুন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি এটা করেছেন? সাহাবীরা কি এটা করেছেন? যদি উত্তর না হয়, তাহলে সেটা বিদআত। দীনের ক্ষেত্রে নতুনত্ব আনা যায় না। তবে দুনিয়াবী বিষয়ে নতুনত্ব আনায় কোনো সমস্যা নেই, যেমন প্রযুক্তি, ব্যবসা ইত্যাদি।

৮. আল্লাহর ওলীদের সম্মান করা কি শিরক?

আল্লাহর নেক বান্দা ও ওলীদের সম্মান করা শিরক নয়, বরং ভালো কাজ। কিন্তু তাদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা, তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া, তাদের মাধ্যমে বরকত পাওয়ার আশা করা - এগুলো শিরক। মনে রাখবেন, সম্মান এবং ইবাদতের মধ্যে পার্থক্য আছে।

৯. জ্যোতিষশাস্ত্র এবং রাশিফল দেখা কতটা ক্ষতিকর?

জ্যোতিষশাস্ত্র এবং রাশিফলে বিশ্বাস করা কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। কারণ গায়েব বা অদৃশ্য জগতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে। যে ব্যক্তি গণক বা জ্যোতিষীর কথায় বিশ্বাস করে, সে যেন আল্লাহর উপর অবতীর্ণ বিষয়কে অস্বীকার করল। এমনকি বিনোদনের জন্য বা মজা করে দেখাও উচিত নয়, কারণ এতে শয়তানের পথ খোলা হয়।

১০. ঈমান দুর্বল হয়ে গেলে কী করব?

ঈমান বৃদ্ধি-হ্রাস হয় এটা স্বাভাবিক। ঈমান শক্তিশালী করার জন্য: নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করুন এবং অর্থ বুঝে পড়ুন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় করুন, আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করুন, নেক বান্দাদের সাথে থাকুন, ইসলামী জ্ঞান অর্জন করুন এবং মৃত্যু ও আখিরাত নিয়ে চিন্তা করুন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আল্লাহর কাছে হেদায়াত চাওয়া।

সহায়ক রেফারেন্স

এই বিষয়ে আরও জানতে আপনি নিম্নলিখিত রিসোর্সগুলো দেখতে পারেন:

এছাড়াও নির্ভরযোগ্য ইসলামিক ওয়েবসাইট এবং আলেমদের লেকচার থেকে জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। সর্বদা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে যাচাই করে নিতে হবে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথের হেদায়াত দান করুন এবং শিরক থেকে রক্ষা করুন। আমীন।

Previous
Next Post »

Please do not enter any spam link in the comment box. ConversionConversion EmoticonEmoticon