ইদ্রিস আলাইহিস সালাম: শেষ মুমিনদের আশ্রয়স্থল - যখন পৃথিবী পাপে নিমজ্জিত হয়েছিল
ভূমিকা
মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন অনেক সময় এসেছে যখন সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকা মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজনে পরিণত হয়েছে। নবী ইদ্রিস আলাইহিস সালামের যুগও ছিল এমনই একটি কঠিন সময়, যখন তিনি এবং তাঁর অনুসারীরা পাপাচারের সমুদ্রে সত্যের দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। আজকের আর্টিকেলে আমরা জানব এই মহান নবীর জীবনী, তাঁর সংগ্রাম এবং কীভাবে তিনি শেষ বিশ্বাসীদের জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছিলেন।
ইদ্রিস আলাইহিস সালাম: পরিচয় ও বংশপরিচয়
হযরত ইদ্রিস আলাইহিস সালাম ছিলেন আদম আলাইহিস সালামের তৃতীয় প্রজন্মের একজন মহান নবী। তাঁর পূর্ণ নাম ছিল ইদ্রিস ইবনে ইয়ারিদ ইবনে মাহলাইল। কুরআন শরীফে তাঁর নাম দুইবার উল্লেখ করা হয়েছে এবং আল্লাহ তাআলা তাঁকে নবুওয়াত ও সত্যবাদিতার গুণে ভূষিত করে উচ্চ মর্যাদা দান করেছিলেন।
সূরা মারইয়ামে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর স্মরণ করুন ইদ্রিসের কথা এই কিতাবে। নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন সত্যবাদী, নবী। এবং আমি তাকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছি।" (সূরা মারইয়াম: ৫৬-৫৭)
ইসলামিক পণ্ডিতদের মতে, ইদ্রিস আলাইহিস সালাম ছিলেন হযরত নূহ আলাইহিস সালামের পূর্ববর্তী এবং হযরত শীষ আলাইহিস সালামের পরবর্তী নবী।
যে যুগে ইদ্রিস আ. আবির্ভূত হয়েছিলেন
ইদ্রিস আলাইহিস সালামের যুগ ছিল মানব সভ্যতার প্রাথমিক পর্যায়, কিন্তু তখনই মানুষের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয় শুরু হয়ে গিয়েছিল। হযরত আদম ও শীষ আলাইহিমাস সালামের শিক্ষা থেকে মানুষ ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল।
সেই সময়ের সমাজে যে বিষয়গুলো প্রকট আকার ধারণ করেছিল:
নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র
- তাওহীদের বিস্মৃতি: মানুষ এক আল্লাহর ইবাদত থেকে বিচ্যুত হয়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির পূজা শুরু করেছিল।
- সামাজিক অবিচার: ধনী-গরিবের মধ্যে বিশাল বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছিল এবং শক্তিশালীরা দুর্বলদের উপর অত্যাচার করত।
- মিথ্যাচার ও প্রতারণা: ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতারণা, ওজনে কম দেওয়া এবং মিথ্যা বলা সাধারণ ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল।
- হত্যা ও রক্তপাত: কাবিল কর্তৃক হাবিলের হত্যার পর থেকে মানুষের মধ্যে হিংসা ও রক্তপাতের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
এমন এক অন্ধকার যুগে আল্লাহ তাআলা ইদ্রিস আলাইহিস সালামকে নবুওয়াত দান করেন।
ইদ্রিস আ. এর দাওয়াত ও সংগ্রাম
হযরত ইদ্রিস আলাইহিস সালাম তাঁর নবুওয়াতি জীবনে মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান করেছিলেন। তাঁর দাওয়াতের মূল বিষয়গুলো ছিল:
তাওহীদের প্রতি আহ্বান
তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকতেন এবং শিরক থেকে বিরত থাকতে বলতেন। তিনি বলতেন যে, যিনি আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন, তিনিই কেবল ইবাদতের যোগ্য।
নৈতিকতা ও ন্যায়বিচার
ইদ্রিস আলাইহিস সালাম সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতেন। তিনি মানুষকে সততা, বিশ্বস্ততা এবং পরস্পরের প্রতি দয়ালু হতে শিক্ষা দিতেন।
জ্ঞান ও শিক্ষার প্রসার
ইসলামিক ইতিহাসবিদদের মতে, ইদ্রিস আলাইহিস সালাম ছিলেন প্রথম মানুষ যিনি কলম দিয়ে লিখতে শিখেছিলেন। তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় উৎসাহ দিতেন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিতশাস্ত্র সহ বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন।
ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) তাঁর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে, ইদ্রিস আলাইহিস সালাম ৩০টি সহীফা (ঐশী পুস্তক) লাভ করেছিলেন।
মাত্র কয়েকজন বাকি: শেষ বিশ্বাসীদের অবস্থান
ইদ্রিস আলাইহিস সালামের দীর্ঘ দাওয়াতি কাজের পরেও অধিকাংশ মানুষ তাঁর কথায় কর্ণপাত করেনি। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, তাঁর অনুসারীদের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত।
কেন বেশিরভাগ মানুষ ঈমান আনেনি?
- প্রাচীন রীতিনীতির প্রতি আসক্তি: মানুষ পূর্বপুরুষদের পথে চলতে অভ্যস্ত ছিল এবং নতুন শিক্ষা গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করত।
- দুনিয়াবি স্বার্থ: যারা সমাজে ক্ষমতাবান ও ধনী ছিল, তারা তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ইদ্রিস আলাইহিস সালামের বিরোধিতা করেছিল।
- শয়তানের প্রতারণা: শয়তান মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য নানা কুমন্ত্রণা দিয়ে আল্লাহর পথ থেকে দূরে রাখত।
শেষ বিশ্বাসীদের বৈশিষ্ট্য
যারা ইদ্রিস আলাইহিস সালামের সাথে ঈমানের উপর অটল ছিলেন, তাদের কিছু বিশেষ গুণাবলী ছিল:
দৃঢ় ঈমান: তারা সংখ্যায় কম হলেও আল্লাহর উপর তাদের বিশ্বাস ছিল পাহাড়ের মতো মজবুত।
ধৈর্য ও সহনশীলতা: সমাজের বিরোধিতা ও নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েও তারা সত্যের পথে অটল থাকতেন।
একে অপরকে সহযোগিতা: অল্প সংখ্যক হওয়ায় তারা পরস্পরকে সাহায্য করতেন এবং একসাথে ইবাদত করতেন।
দুনিয়ার প্রলোভন থেকে মুক্ত: তারা দুনিয়াবি স্বার্থের চেয়ে আখিরাতকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।
ইদ্রিস আ. এর বিশেষ মর্যাদা
আল্লাহ তাআলা ইদ্রিস আলাইহিস সালামকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছিলেন। কুরআনে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাঁকে "উচ্চ স্থানে" উন্নীত করেছেন।
উচ্চ মর্যাদার ব্যাখ্যা
ইসলামিক পণ্ডিতদের মধ্যে এই "উচ্চ স্থান" সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে:
প্রথম মত: কিছু মুফাসিসির মতে, আল্লাহ তাআলা ইদ্রিস আলাইহিস সালামকে জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নিয়েছিলেন, যেমন ঈসা আলাইহিস সালামকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
দ্বিতীয় মত: অন্য কিছু আলেমের মতে, এটি দ্বারা তাঁর উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের কথা বোঝানো হয়েছে যা তিনি আল্লাহর কাছে লাভ করেছিলেন।
তৃতীয় মত: হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মেরাজের রাতে নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চতুর্থ আসমানে ইদ্রিস আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
ইদ্রিস আ. এর বিশেষ গুণাবলী
সত্যবাদিতা: কুরআনে তাঁকে "সিদ্দিক" (অত্যন্ত সত্যবাদী) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ধৈর্যশীলতা: দীর্ঘ সময় ধরে মানুষকে হেদায়েতের পথে ডাকার ক্ষেত্রে তিনি অসীম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন।
জ্ঞানী: তিনি ছিলেন তাঁর যুগের অন্যতম জ্ঞানী ব্যক্তি।
ন্যায়পরায়ণ: সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ।
ইদ্রিস আ. থেকে আমাদের শিক্ষা
হযরত ইদ্রিস আলাইহিস সালামের জীবন থেকে আমরা যে শিক্ষা নিতে পারি:
১. সংখ্যালঘু হওয়ার ভয় না করা
ইদ্রিস আলাইহিস সালাম এবং তাঁর অনুসারীরা সংখ্যায় কম হলেও সত্যের উপর অটল ছিলেন। এটি আমাদের শেখায় যে, সত্য সর্বদা সংখ্যাগরিষ্ঠদের সাথে থাকে না। কখনো কখনো সংখ্যালঘুরাই সঠিক পথে থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"ইসলাম শুরু হয়েছিল অপরিচিত অবস্থায়, এবং তা আবার অপরিচিত অবস্থায় ফিরে আসবে। সুতরাং সুসংবাদ ওই অপরিচিতদের জন্য।" (সহীহ মুসলিম)
২. জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব
ইদ্রিস আলাইহিস সালাম জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি পার্থিব জ্ঞান অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ।
৩. ধৈর্যের সাথে দাওয়াত
দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের বিরোধিতার সম্মুখীন হওয়ার পরেও তিনি তাঁর দাওয়াতি কাজ অব্যাহত রেখেছিলেন। এটি আমাদের শেখায় যে, সত্য প্রচারে ধৈর্যশীল থাকতে হয়।
৪. দুনিয়ার প্রলোভন থেকে দূরে থাকা
ইদ্রিস আলাইহিস সালাম এবং তাঁর অনুসারীরা দুনিয়াবি স্বার্থের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। বর্তমান যুগেও এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
৫. সত্যবাদিতা অবলম্বন
ইদ্রিস আলাইহিস সালাম "সিদ্দিক" উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। সত্য বলা এবং সততার সাথে জীবনযাপন করা প্রতিটি মুমিনের কর্তব্য।
বর্তমান যুগের সাথে সাদৃশ্য
ইদ্রিস আলাইহিস সালামের যুগের সাথে বর্তমান যুগের অনেক মিল রয়েছে। আজকের দিনেও:
নৈতিক অবক্ষয়
বর্তমান যুগে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। মিথ্যা, প্রতারণা, অবিচার সমাজে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
বস্তুবাদী চিন্তাধারা
মানুষ দুনিয়াবি সম্পদ ও ভোগ-বিলাসের পিছনে ছুটছে, আখিরাতের কথা ভুলে গেছে।
প্রযুক্তির অপব্যবহার
আধুনিক প্রযুক্তি যা মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি হয়েছিল, তার অনেক অপব্যবহার হচ্ছে পাপের কাজে।
সত্যবাদীদের সংখ্যা হ্রাস
যারা দ্বীনের উপর সঠিকভাবে আমল করছেন, তাদের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে। তবে ইদ্রিস আলাইহিস সালামের যুগের মতো, আজও কিছু মানুষ আছেন যারা সত্যের পথে অটল আছেন।
শেষ বিশ্বাসীদের জন্য সুসংবাদ
যারা এই কঠিন সময়ে সত্যের পথে অটল থাকবেন, তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশেষ পুরস্কার রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি এমন সময়ে দ্বীনের উপর থাকবে যখন চারপাশে ফিতনা-ফাসাদ হবে, তার জন্য ৫০ জন সাহাবীর সমান সওয়াব রয়েছে।" (তিরমিযী)
এটি কতটা বড় সম্মানের বিষয়! যারা কঠিন সময়ে ঈমানের উপর থাকবে, তারা সাহাবায়ে কেরামের মতো মর্যাদা লাভ করবেন।
কীভাবে সত্যের পথে অটল থাকা যায়?
বর্তমান যুগে ইদ্রিস আলাইহিস সালামের অনুসারীদের মতো সত্যের পথে অটল থাকার জন্য কিছু পদক্ষেপ:
১. জ্ঞান অর্জন
দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করুন। কুরআন-হাদিস পড়ুন এবং বুঝার চেষ্টা করুন। যত বেশি জ্ঞান থাকবে, তত বেশি দৃঢ় থাকা সম্ভব হবে।
২. নেক সংসর্গ
ভালো মানুষদের সাথে চলুন। যারা দ্বীনের উপর আছেন, তাদের সাথে সম্পর্ক রাখুন। একা থাকলে দুর্বল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৩. নিয়মিত ইবাদত
পাঁচ ওয়াক্ত নামায, রোযা, যাকাত ইত্যাদি নিয়মিত আদায় করুন। এগুলো আপনার ঈমানকে মজবুত রাখবে।
৪. দুআ
আল্লাহর কাছে হেদায়েত ও দৃঢ়তার জন্য দুআ করুন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রায়ই এই দুআ করতেন:
"ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত কালবি আলা দ্বীনিক" (হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে তোমার দ্বীনের উপর দৃঢ় রাখো।)
৫. ধৈর্য ধারণ
কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণ করুন। মনে রাখবেন, আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।
৬. দাওয়াতি কাজ
সাধ্যমত অন্যদেরকে সত্যের পথে আহ্বান করুন। এটি আপনার নিজের ঈমানকেও শক্তিশালী করবে।
ইদ্রিস আ. এর জীবনী থেকে আধুনিক সমাজের জন্য দিকনির্দেশনা
সমাজ সংস্কারে ভূমিকা
ইদ্রিস আলাইহিস সালাম শুধু ধর্মীয় শিক্ষাই দেননি, সমাজ সংস্কারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি ন্যায়বিচার, সততা এবং পরস্পরের প্রতি দয়ার শিক্ষা দিয়েছিলেন।
বর্তমানে আমাদেরও উচিত সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা। যেখানেই অবিচার দেখব, সেখানে সাধ্যমত ন্যায়ের পক্ষে কথা বলা।
পরিবারে দ্বীনি পরিবেশ তৈরি
ইদ্রিস আলাইহিস সালামের অনুসারীরা পরস্পরের সাহায্যে একে অপরকে দৃঢ় রাখতেন। একইভাবে, আমাদের পরিবারে দ্বীনি পরিবেশ তৈরি করা উচিত যাতে পরিবারের সবাই সত্যের পথে থাকতে পারে।
যুব সমাজকে সঠিক পথে পরিচালনা
বর্তমান যুগের যুবকরা নানা বিভ্রান্তিতে পড়ছে। তাদেরকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। ইদ্রিস আলাইহিস সালামের মতো জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাথে তাদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছাতে হবে।
উপসংহার
হযরত ইদ্রিস আলাইহিস সালামের জীবনী আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি এমন এক যুগে বাস করেছিলেন যখন পাপাচার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সত্যের পথে থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। কিন্তু তারপরেও তিনি এবং তাঁর অনুসারীরা দৃঢ়ভাবে তাওহীদের পথে অটল ছিলেন।
বর্তমান যুগে আমরাও একই রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন। চারপাশে পাপাচার, নৈতিক অবক্ষয় এবং দ্বীন থেকে দূরত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ইদ্রিস আলাইহিস সালামের মতো যারা সংখ্যালঘু হয়েও সত্যের উপর থাকে, আল্লাহ তাদেরকে বিশেষ মর্যাদা দান করেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সত্যের পথে অটল থাকার তাওফিক দান করুন এবং ইদ্রিস আলাইহিস সালামের মতো সত্যবাদী বান্দা হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: ইদ্রিস আলাইহিস সালাম কোন যুগে জীবিত ছিলেন?
উত্তর: ইদ্রিস আলাইহিস সালাম হযরত আদম আলাইহিস সালামের তৃতীয় প্রজন্মে জীবিত ছিলেন। তিনি হযরত শীষ আলাইহিস সালামের পরবর্তী এবং হযরত নূহ আলাইহিস সালামের পূর্ববর্তী নবী ছিলেন। সঠিক সময়কাল নির্ধারণ করা কঠিন, তবে ইসলামিক পণ্ডিতদের মতে তিনি মানব সভ্যতার প্রাথমিক যুগে বাস করতেন।
প্রশ্ন ২: কুরআনে ইদ্রিস আলাইহিস সালামকে কয়বার উল্লেখ করা হয়েছে?
উত্তর: কুরআন শরীফে ইদ্রিস আলাইহিস সালামের নাম দুইবার উল্লেখ করা হয়েছে। একবার সূরা মারইয়ামে (আয়াত ৫৬-৫৭) এবং আরেকবার সূরা আম্বিয়ায় (আয়াত ৮৫) নবীদের তালিকায়। তাঁকে সত্যবাদী এবং নবী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রশ্ন ৩: ইদ্রিস আলাইহিস সালামের বিশেষত্ব কী ছিল?
উত্তর: ইদ্রিস আলাইহিস সালামের অনেক বিশেষত্ব ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সত্যবাদী, জ্ঞানী এবং ধৈর্যশীল। ইসলামিক ইতিহাসবিদদের মতে, তিনিই প্রথম কলম দিয়ে লিখতে শিখেছিলেন। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গণিতশাস্ত্রেও পারদর্শী ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছিলেন।
প্রশ্ন ৪: "উচ্চ স্থানে উন্নীত" বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: কুরআনে বলা হয়েছে আল্লাহ ইদ্রিস আলাইহিস সালামকে উচ্চ স্থানে উন্নীত করেছেন। এর ব্যাখ্যায় পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ বলেন তাঁকে জীবিত আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল, কেউ বলেন এটি তাঁর মর্যাদার কথা বোঝায়। মেরাজের হাদিস অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (সা.) চতুর্থ আসমানে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
প্রশ্ন ৫: ইদ্রিস আলাইহিস সালামের অনুসারীদের সংখ্যা কম ছিল কেন?
উত্তর: ইদ্রিস আলাইহিস সালামের যুগে মানুষ তাওহীদ থেকে দূরে সরে গিয়ে পাপাচারে লিপ্ত হয়েছিল। পূর্বপুরুষদের রীতিনীতির প্রতি আসক্তি, দুনিয়াবি স্বার্থ এবং শয়তানের প্রতারণার কারণে বেশিরভাগ মানুষ তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করেনি। যারা ঈমান এনেছিলেন, তারা ছিলেন দৃঢ়চিত্ত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণকারী।
প্রশ্ন ৬: বর্তমান যুগে ইদ্রিস আলাইহিস সালামের জীবন থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি?
উত্তর: ইদ্রিস আলাইহিস সালামের জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি যে সংখ্যালঘু হলেও সত্যের পথে অটল থাকতে হয়। জ্ঞান অর্জন করতে হয়, ধৈর্যের সাথে দাওয়াতি কাজ করতে হয় এবং সত্যবাদিতা অবলম্বন করতে হয়। বর্তমান যুগেও চারপাশে পাপাচার বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাই আমাদের দৃঢ়ভাবে ইসলামের উপর থাকতে হবে।
প্রশ্ন ৭: হাদিসে ইদ্রিস আলাইহিস সালাম সম্পর্কে কী বর্ণিত আছে?
উত্তর: হাদিস শরীফে ইদ্রিস আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। মেরাজের রাতে নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চতুর্থ আসমানে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। ইমাম ইবনে কাসীরসহ বিভিন্ন মুহাদ্দিস তাঁর জ্ঞান এবং সত্যবাদিতার বিশেষ উল্লেখ করেছেন।
প্রশ্ন ৮: কঠিন সময়ে কীভাবে ঈমানের উপর দৃঢ় থাকা যায়?
উত্তর: কঠিন সময়ে ঈমানের উপর দৃঢ় থাকার জন্য: (১) নিয়মিত কুরআন-হাদিস পড়ুন এবং দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করুন, (২) নেক মানুষদের সাহচর্য গ্রহণ করুন, (৩) পাঁচ ওয়াক্ত নামায নিয়মিত আদায় করুন, (৪) আল্লাহর কাছে হেদায়েতের জন্য দুআ করুন, (৫) ধৈর্য ধারণ করুন এবং (৬) অন্যদেরকে সত্যের পথে আহ্বান করুন।
রেফারেন্স:
- তাফসীর ইবনে কাসীর
- সহীহ মুসলিম
- জামে তিরমিযী
- কুরআন শরীফ: সূরা মারইয়াম ও সূরা আম্বিয়া
- সীরাতুন নাবাওইয়্যাহ
লেখক নোট: এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ গবেষণা এবং সহীহ ইসলামিক সূত্রের ভিত্তিতে লেখা হয়েছে। কোনো তথ্যে ভুল পেলে সংশোধনের জন্য জানাতে পারেন।

Please do not enter any spam link in the comment box. ConversionConversion EmoticonEmoticon