হযরত ইদ্রিস (আ.) এর ঘটনা: কেন তারা পাপী হলো এবং তবুও কেন যথেষ্ট ছিল না?


হযরত_ইদ্রিস_(আ.)_এর_ঘটনা











হযরত ইদ্রিস (আ.) এর ঘটনা: কেন তারা পাপী হলো এবং তবুও কেন যথেষ্ট ছিল না?

ভূমিকা

হযরত ইদ্রিস (আ.) ইসলামের ইতিহাসে একজন অত্যন্ত সম্মানিত নবী। তাঁর জীবন ও ঘটনাবলী আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় বহন করে। কুরআন মাজিদ তাঁর সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রয়েছে। তাঁর সময়কালে মানুষের মধ্যে যে পাপাচার শুরু হয়েছিল এবং কীভাবে তারা সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছিল, তা বোঝা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

এই নিবন্ধে আমরা হযরত ইদ্রিস (আ.) এর জীবনী, তাঁর সময়ের মানুষের পাপাচার, এবং কেন তাদের অবাধ্যতা যথেষ্ট ছিল না সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। নবী-রাসূলদের জীবনী থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি।

হযরত ইদ্রিস (আ.) এর পরিচয়

হযরত ইদ্রিস (আ.) মানব ইতিহাসের প্রাচীন নবীদের মধ্যে অন্যতম। তিনি হযরত আদম (আ.) এর পরবর্তী প্রজন্মে আগমন করেন। কুরআনে তাঁর নাম দুই স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে।

কুরআনে হযরত ইদ্রিস (আ.)

আল্লাহ তায়ালা সূরা মারইয়াম এ বলেন:

"আর স্মরণ করুন কিতাবে ইদ্রিসের কথা। নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন সত্যবাদী ও নবী। আমি তাকে উচ্চ মর্যাদায় সমুন্নত করেছি।" (সূরা মারইয়াম: ৫৬-৫৭)

সূরা আল-আম্বিয়া তেও তাঁর উল্লেখ রয়েছে ধৈর্যশীল নবীদের তালিকায়।

তাঁর নামের অর্থ

"ইদ্রিস" শব্দটি আরবি "দারাসা" ধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ হলো "অধ্যয়ন করা" বা "শিক্ষা দেওয়া"। তিনি ছিলেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতীক। ইসলামিক স্কলারদের মতে, বাইবেলে তাঁকে "হনোক" (Enoch) নামে অভিহিত করা হয়েছে।

হযরত ইদ্রিস (আ.) এর জীবন ও কর্ম

জ্ঞান ও প্রজ্ঞা

হযরত ইদ্রিস (আ.) তাঁর যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন হাদিস ও ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী:

  • তিনি প্রথম কলম ব্যবহার করে লেখালেখি শুরু করেন
  • জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গণিত শাস্ত্রে তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল
  • তিনি কাপড় সেলাই করার পদ্ধতি মানুষকে শিখিয়েছিলেন
  • ৩০টি সহিফা (ঐশী গ্রন্থ) তাঁর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল

এই তথ্যগুলো ইসলামিক হিস্ট্রি থেকে জানা যায়।

তাঁর ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য

হযরত ইদ্রিস (আ.) ছিলেন অত্যন্ত ইবাদতগুজার। তিনি দিনরাত আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে এবং দুনিয়াবিমুখ। তাঁর প্রধান কাজ ছিল:

  • আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দেওয়া
  • মানুষকে সৎপথে আনার চেষ্টা করা
  • শিরক ও পাপাচার থেকে মানুষকে বিরত রাখা
  • নৈতিকতা ও সততার শিক্ষা দেওয়া

তাঁর সময়ের মানুষের অবস্থা

হযরত ইদ্রিস (আ.) এর সময়কাল ছিল হযরত আদম (আ.) এর পরবর্তী যুগ। এই সময়ে মানব সমাজে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করে।

প্রাথমিক অবস্থা

হযরত আদম (আ.) এবং তাঁর পরবর্তী কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত মানুষ তাওহিদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে শয়তানের প্রভাবে এবং নফসের তাড়নায় মানুষ সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হতে শুরু করে।

পাপাচারের সূচনা

হযরত ইদ্রিস (আ.) এর যুগে যে পাপাচার শুরু হয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

১. ধর্মীয় অবক্ষয়

মানুষ ধীরে ধীরে আল্লাহর হুকুম থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। তারা নামাজ, রোজা এবং অন্যান্য ইবাদতে অবহেলা করতে শুরু করে। ধর্মীয় শিক্ষা ও অনুশীলন হ্রাস পায়।

২. নৈতিক অধঃপতন

সমাজে মিথ্যা, প্রতারণা, চুরি, এবং অন্যায়-অবিচার বৃদ্ধি পেতে থাকে। মানুষ একে অপরের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে শুরু করে। সততা ও বিশ্বস্ততা র মূল্য কমে যায়।

৩. বস্তুবাদিতা

মানুষ দুনিয়াবি সম্পদ ও ভোগ-বিলাসের প্রতি অতিমাত্রায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। তারা আখিরাতের চিন্তা ভুলে গিয়ে শুধুমাত্র পার্থিব জীবনের পেছনে ছুটতে থাকে।

৪. শিরকের প্রবেশ

এটি ছিল সবচেয়ে মারাত্মক পাপ। কিছু মানুষ আল্লাহর সাথে শরিক করা শুরু করে। তারা বিভিন্ন বস্তু ও ব্যক্তির পূজা করতে থাকে।

কেন তারা পাপী হলো?

মানুষ পাপী হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে যা আমরা ইসলামী শিক্ষা ও ইতিহাস থেকে জানতে পারি।

শয়তানের প্রতারণা

শয়তান আদম সন্তানের চিরশত্রু। সে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য সর্বদা প্রচেষ্টা চালায়। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন:

"নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু, অতএব তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ কর। সে তার দলবলকে কেবল এজন্যই আহ্বান করে যেন তারা জ্বলন্ত আগুনের অধিবাসী হয়।" (সূরা ফাতির: ৬)

শয়তান মানুষকে ধোঁকা দেয় বিভিন্ন উপায়ে:

  • পাপকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করে
  • সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য বলে প্রচার করে
  • মানুষের দুর্বলতাগুলো কাজে লাগায়
  • ধীরে ধীরে পাপের দিকে নিয়ে যায়

নফসের প্রবৃত্তি

মানুষের মধ্যে কিছু স্বাভাবিক প্রবৃত্তি রয়েছে যা তাকে পাপের দিকে টানে। কুরআনে বলা হয়েছে:

"নিশ্চয়ই নফস মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়।" (সূরা ইউসুফ: ৫৩)

নফসের কিছু বৈশিষ্ট্য:

  • লোভ ও লালসা
  • অহংকার ও আত্মম্ভরিতা
  • হিংসা ও বিদ্বেষ
  • অলসতা ও দায়িত্বহীনতা

নফসের সংযম সম্পর্কে ইসলাম বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

জ্ঞানের অভাব

যখন মানুষ ধর্মীয় জ্ঞান থেকে দূরে সরে যায়, তখন তারা সহজেই পাপের শিকার হয়। তারা জানে না কোনটি সঠিক এবং কোনটি ভুল। ফলে তারা ভুল পথে চলতে থাকে।

খারাপ সঙ্গ

খারাপ সঙ্গী মানুষকে পাপের দিকে নিয়ে যায়। যখন একজন মানুষ পাপী লোকদের সাথে মেলামেশা করে, ধীরে ধীরে সেও তাদের মতো হয়ে যায়। রাসূল (সা.) বলেছেন:

"মানুষ তার বন্ধুর ধর্মের উপর থাকে। অতএব, তোমাদের প্রত্যেকের উচিত দেখে নেওয়া সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।" (আবু দাউদ ও তিরমিযি)

দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ

যখন মানুষ দুনিয়াকে সবকিছু মনে করে এবং আখিরাতকে ভুলে যায়, তখন সে যেকোনো পাপ করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। সম্পদ, ক্ষমতা, এবং খ্যাতির লোভে মানুষ সীমা লঙ্ঘন করে।

তবুও কেন যথেষ্ট ছিল না?

এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হযরত ইদ্রিস (আ.) মানুষকে সৎপথে আনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। তিনি তাদের জ্ঞান দান করেছিলেন, নসিহত করেছিলেন, এবং আল্লাহর পথে ডেকেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেকে হেদায়েত পায়নি। এর কারণ কী?

হেদায়েত আল্লাহর হাতে

প্রথমত, মনে রাখতে হবে যে প্রকৃত হেদায়েত আল্লাহর হাতে। নবীরা শুধুমাত্র পৌঁছে দেন এবং দাওয়াত দেন। কিন্তু কার অন্তরে হেদায়েত প্রবেশ করবে তা আল্লাহই নির্ধারণ করেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

"নিশ্চয়ই আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে হেদায়েত দিতে পারবেন না, বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দান করেন।" (সূরা আল-কাসাস: ৫৬)

মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। মানুষ চাইলে সত্য গ্রহণ করতে পারে, আবার চাইলে প্রত্যাখ্যানও করতে পারে। এই স্বাধীনতা না থাকলে পরীক্ষা হতো না এবং পুরস্কার বা শাস্তির কোনো অর্থ থাকতো না।

কুরআনে বলা হয়েছে:

"তুমি বলো, সত্য তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এসেছে। অতএব যার ইচ্ছা বিশ্বাস করুক এবং যার ইচ্ছা অবিশ্বাস করুক।" (সূরা আল-কাহফ: ২৯)

অহংকার ও অবাধ্যতা

অনেক মানুষ সত্য জানার পরও অহংকারের কারণে তা মানতে অস্বীকার করে। তারা নিজেদের বুদ্ধি ও ক্ষমতার উপর অতিরিক্ত নির্ভর করে এবং আল্লাহর নির্দেশনা মানতে চায় না।

ফেরাউন এবং তার সম্প্রদায় এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তারা স্পষ্ট নিদর্শন দেখার পরও ঈমান আনেনি।

পার্থিব স্বার্থ

কিছু মানুষ সত্য জানে কিন্তু তাদের পার্থিব স্বার্থের কারণে তা গ্রহণ করে না। তারা ভয় পায় যে সত্য গ্রহণ করলে তাদের সম্পদ, ক্ষমতা বা সামাজিক মর্যাদা হারাতে হবে।

মক্কার কাফেররা অনেকে রাসূল (সা.) এর সত্যতা বুঝতো কিন্তু নেতৃত্ব ও সম্পদের মোহে তারা ইসলাম গ্রহণ করেনি।

হৃদয়ের কঠোরতা

পাপের পুনরাবৃত্তি হৃদয়কে কঠিন করে দেয়। যখন একজন মানুষ বারবার পাপ করে এবং আল্লাহর নিদর্শন অস্বীকার করে, তখন তার হৃদয় সত্যের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

আল্লাহ বলেন:

"তারপর তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেল, তা পাথরের মতো বা তার চেয়েও কঠিন।" (সূরা আল-বাকারা: ৭৪)

সামাজিক চাপ

অনেক সময় মানুষ সত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয় কিন্তু সমাজের চাপে বা পরিবারের ভয়ে তা গ্রহণ করতে পারে না। তারা চিন্তা করে মানুষ কী বলবে, সমাজ কীভাবে দেখবে।

অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তি

কিছু মানুষ প্রকৃত সত্য বুঝতে পারে না। তারা বিভিন্ন মিথ্যা ধারণা ও কুসংস্কারে আবদ্ধ থাকে। শয়তান তাদের মনে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।

হযরত ইদ্রিস (আ.) এর দাওয়াতের পদ্ধতি

হযরত ইদ্রিস (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে হেদায়েতের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন।

জ্ঞান দান

তিনি মানুষকে জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দিতেন। জ্ঞানী মানুষ সহজে সত্য বুঝতে পারে। তিনি বিশ্বাস করতেন শিক্ষিত সমাজ সুপথগামী হয়।

নম্র ও কোমল আচরণ

তিনি মানুষের সাথে নম্র ও কোমল ব্যবহার করতেন। কঠোরতা নয়, বরং ভালোবাসা ও সহানুভূতি দিয়ে তিনি মানুষের হৃদয় জয় করতে চেষ্টা করেছিলেন।

ব্যক্তিগত উদাহরণ

তিনি নিজে যা বলতেন তা নিজে আমল করতেন। তাঁর জীবনযাপন ছিল তাঁর শিক্ষার জীবন্ত উদাহরণ। মানুষ তাঁর চরিত্র দেখে প্রভাবিত হতো।

ধৈর্য ও অধ্যবসায়

তিনি মানুষের অবাধ্যতা সত্ত্বেও ধৈর্যের সাথে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে গেছেন। তিনি হতাশ হননি বরং আল্লাহর উপর ভরসা রেখে কাজ করে গেছেন।

আমাদের জন্য শিক্ষা

হযরত ইদ্রিস (আ.) এর ঘটনা থেকে আমরা অনেক মূল্যবান শিক্ষা নিতে পারি।

জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব

ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। জ্ঞান ছাড়া মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হয়। রাসূল (সা.) বলেছেন:

"প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ।" (ইবনে মাজাহ)

সৎসঙ্গ নির্বাচন

খারাপ সঙ্গ থেকে দূরে থাকা এবং ভালো মানুষের সাথে চলা অত্যন্ত জরুরি। সৎসঙ্গ মানুষকে সৎপথে রাখতে সাহায্য করে।

শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা

প্রতিদিন আল্লাহর কাছে শয়তানের প্ররোচনা থেকে আশ্রয় চাওয়া উচিত। নিয়মিত দোয়া ও যিকির শয়তানকে দূরে রাখে।

নফসের সংযম

নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা শিখতে হবে। রোজা, নামাজ, এবং অন্যান্য ইবাদত নফসকে সংযত রাখতে সাহায্য করে।

দুনিয়ার প্রতি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি

দুনিয়া সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করার দরকার নেই, কিন্তু এটাকে সবকিছু মনে করাও ঠিক নয়। দুনিয়া হলো আখিরাতের ক্ষেত। এখানে আমরা আমল করবো এবং আখিরাতে ফল পাবো।

তাওবার গুরুত্ব

পাপ হয়ে গেলে দেরি না করে তাওবা করা উচিত। আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। তিনি বলেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২২২)

দাওয়াতের দায়িত্ব

প্রতিটি মুসলমানের উচিত সাধ্যমত মানুষকে সৎপথে আনার চেষ্টা করা। যদিও ফলাফল আল্লাহর হাতে, কিন্তু আমাদের দায়িত্ব হলো দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া।

ধৈর্যধারণ

দীনের পথে চলতে গিয়ে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। তখন ধৈর্য ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।

বর্তমান যুগের প্রাসঙ্গিকতা

হযরত ইদ্রিস (আ.) এর যুগের পরিস্থিতি আজকের যুগের সাথে অনেকটাই মিলে যায়। আজও আমরা দেখি:

ধর্মীয় অবহেলা

বর্তমান সমাজে অনেকে ধর্মীয় বিধি-বিধান মানতে অনীহা প্রকাশ করে। নামাজ, রোজা, যাকাত ইত্যাদিতে অবহেলা করা হয়।

বস্তুবাদী মানসিকতা

আধুনিক সমাজ অর্থ ও সম্পদকেই সবকিছু মনে করে। মানুষ আখিরাতের চিন্তা ভুলে শুধু দুনিয়ার পেছনে ছুটছে।

নৈতিক অধঃপতন

সমাজে মিথ্যা, প্রতারণা, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পর্ক ইত্যাদি বৃদ্ধি পাচ্ছে। নৈতিকতার মান ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।

সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব

বর্তমানে সামাজিক মাধ্যম মানুষকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করছে। এটি ভালো কাজে যেমন ব্যবহার করা যায়, তেমনি খারাপ কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

উপসংহার

হযরত ইদ্রিস (আ.) এর জীবনী ও তাঁর যুগের ঘটনাবলী আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয়। তাঁর সময়ে মানুষ যেভাবে পাপী হয়েছিল এবং তাঁর নসিহত সত্ত্বেও অনেকে হেদায়েত পায়নি, তা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে হেদায়েত শুধুমাত্র আল্লাহর ইচ্ছায় হয়।

আমাদের দায়িত্ব হলো সর্বদা সত্যের সন্ধান করা, নিজেদের পাপ থেকে বিরত রাখা, এবং অন্যদেরকে সৎপথে আনার চেষ্টা করা। একই সাথে মনে রাখতে হবে যে প্রকৃত হেদায়েত আল্লাহর হাতে এবং প্রতিটি মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি রয়েছে।

হযরত ইদ্রিস (আ.) এর উন্নত চরিত্র, জ্ঞানগর্ভ শিক্ষা, এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আনুগত্য আমাদের জন্য আদর্শ। আল্লাহ আমাদের সকলকে সিরাতুল মুস্তাকিম এ চলার তৌফিক দান করুন এবং হযরত ইদ্রিস (আ.) এর শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার সামর্থ্য দিন। আমিন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন ১: হযরত ইদ্রিস (আ.) কোন যুগে এসেছিলেন?

উত্তর: হযরত ইদ্রিস (আ.) হযরত আদম (আ.) এবং হযরত নূহ (আ.) এর মাঝামাঝি সময়ে এসেছিলেন। তিনি হযরত আদম (আ.) এর তৃতীয় প্রজন্মে ছিলেন। ঐতিহাসিক মতে, তিনি হযরত আদম (আ.) এর প্রায় ৬২২ বছর পরে জন্মগ্রহণ করেন।

প্রশ্ন ২: হযরত ইদ্রিস (আ.) কি আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল?

উত্তর: কুরআনে বলা হয়েছে আল্লাহ তাঁকে "উচ্চ মর্যাদায় সমুন্নত করেছেন।" অনেক ইসলামী পণ্ডিত মনে করেন তাঁকে জীবিত অবস্থায় আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। মূল কথা হলো আল্লাহ তাঁকে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছিলেন।

প্রশ্ন ৩: হযরত ইদ্রিস (আ.) কি কোনো কিতাব পেয়েছিলেন?

উত্তর: হ্যাঁ, হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত ইদ্রিস (আ.) এর উপর ৩০টি সহিফা (ছোট ঐশী পুস্তিকা) অবতীর্ণ হয়েছিল। এগুলোতে আল্লাহর নির্দেশনা এবং জ্ঞানগর্ভ শিক্ষা ছিল।

প্রশ্ন ৪: হযরত ইদ্রিস (আ.) এর সম্প্রদায়ের সবাই কি কাফের হয়ে গিয়েছিল?

উত্তর: না, সবাই কাফের হয়নি। একটি অংশ হযরত ইদ্রিস (আ.) এর অনুসরণ করেছিল এবং তাওহিদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু অনেকেই পাপাচার করেছিল এবং সত্য থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। প্রতিটি নবীর যুগেই কিছু মানুষ ঈমান আনে এবং কিছু অবিশ্বাস করে।

প্রশ্ন ৫: কেন নবীদের দাওয়াত সত্ত্বেও মানুষ ঈমান আনে না?

উত্তর: এর কয়েকটি কারণ রয়েছে: (১) প্রকৃত হেদায়েত আল্লাহর হাতে, (২) মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি রয়েছে, (৩) অহংকার ও অবাধ্যতা, (৪) পার্থিব স্বার্থ, (৫) হৃদয়ের কঠোরতা, এবং (৬) শয়তানের প্ররোচনা। আল্লাহ কাউকে জোর করে ঈমানে আনেন না কারণ তাহলে পরীক্ষা হবে না।

প্রশ্ন ৬: হযরত ইদ্রিস (আ.) কোন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন?

উত্তর: বর্ণনা অনুযায়ী হযরত ইদ্রিস (আ.) কাপড় সেলাই করতেন। তিনিই প্রথম সুই-সুতা দিয়ে কাপড় সেলাই করার পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন। একই সাথে তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দিতেন এবং মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকতেন।

প্রশ্ন ৭: হযরত ইদ্রিস (আ.) এর যুগে কি কোনো আযাব এসেছিল?

উত্তর: ইসলামী সূত্রে হযরত ইদ্রিস (আ.) এর সম্প্রদায়ের উপর কোনো সামষ্টিক আযাবের উল্লেখ নেই। তবে তাঁর পরে হযরত নূহ (আ.) এর সময় মহাপ্লাবনের মাধ্যমে আযাব এসেছিল। হযরত ইদ্রিস (আ.) এর কাজ ছিল মানুষকে সতর্ক করা এবং সৎপথে আনা।

প্রশ্ন ৮: আমরা কীভাবে হযরত ইদ্রিস (আ.) এর শিক্ষা জীবনে প্রয়োগ করতে পারি?

উত্তর: (১) জ্ঞানার্জনে মনোযোগী হওয়া, (২) আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস রাখা, (৩) নিয়মিত ইবাদত করা, (৪) সৎসঙ্গ নির্বাচন করা, (৫) নৈতিকতা ও সততা বজায় রাখা, (৬) দুনিয়ার প্রতি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি রাখা, এবং (৭) অন্যদেরকে সৎপথে আনার চেষ্টা করা।

সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ (Related Articles)

লেখক নোট: এই নিবন্ধটি কুরআন, হাদিস এবং ইসলামী ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্য সূত্র এর উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। হযরত ইদ্রিস (আ.) সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে আপনার নিকটস্থ আলেমদের সাথে যোগাযোগ করুন অথবা ইসলামী গ্রন্থাবলী অধ্যয়ন করুন।

ক্যাটাগরি: ইসলামিক জীবনী, নবীদের ঘটনা, ধর্মীয় শিক্ষা 

Previous
Next Post »

Please do not enter any spam link in the comment box. ConversionConversion EmoticonEmoticon