আর্টিকেলের বিষয়বস্তু — সূচিপত্র
ভূমিকা — শুরুতে মানুষ কোথায় ছিল?
মানবজাতির ইতিহাস শুরু হয়েছিল তাওহিদ বা একত্ববাদ দিয়ে। আদম (আ.) থেকে শুরু করে পৃথিবীর প্রথম মানুষ জানতেন যে একমাত্র আল্লাহই সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং ইবাদতের যোগ্য। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মানুষ আল্লাহর দেওয়া ফিতরাত বা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি থেকে বিচ্যুত হতে থাকে। আর এই বিচ্যুতির সবচেয়ে মারাত্মক রূপ হলো শিরক — অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক বা অংশীদার করা।
প্রশ্ন হলো, মূর্তি তৈরি এবং তার উপাসনা কীভাবে শুরু হলো? কোন মানসিকতা থেকে মানুষ পাথর, কাঠ বা ধাতুর তৈরি বস্তুকে ইলাহ বা মাবুদ বানিয়ে নিল? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং আজকের মুসলমানদের জন্যও অত্যন্ত শিক্ষণীয়। কারণ শিরকের বীজ সূক্ষ্মভাবে যেকোনো সময়, যেকোনো সমাজে বপন হতে পারে।
ইসলামি স্কলাররা বলেন, শিরক কোনো একদিনে আসেনি। এটি এসেছে ধীরে ধীরে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে, ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে। আর তাই শিরকের ইতিহাস বোঝা মানে হলো সেই সূক্ষ্ম পথটি বোঝা — যে পথে হাঁটলে মানুষ আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়।
ইসলামের দৃষ্টিতে শিরক হলো সবচেয়ে বড় পাপ, যা আল্লাহ তাওবা ছাড়া ক্ষমা করবেন না। তাই শিরকের ইতিহাস ও তার শুরুর কারণ জানা প্রতিটি মুমিনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
সম্পর্কিত পোস্ট পড়ুন
মূর্তি তৈরির সূচনা কীভাবে হয়েছিল?
ইসলামিক ইতিহাস ও হাদিসের আলোকে জানা যায়, মূর্তি পূজার শুরু হয়েছিল আদম (আ.) থেকে নুহ (আ.)-এর যুগের মাঝখানে। এই সময়ের ব্যবধান ছিল প্রায় দশটি প্রজন্ম, যে সময়কাল মানুষ তাওহিদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে শয়তান মানুষকে পথ থেকে সরাতে সফল হয়।
নেক মানুষের স্মৃতি রক্ষার প্রচেষ্টা থেকে শুরু
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি গুরুত্বপূর্ণ তাফসির অনুযায়ী, নুহ (আ.)-এর কওমে একসময় পাঁচজন অত্যন্ত নেককার ও সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। তাঁদের নাম ছিল — ওয়াদ্দ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক এবং নাসর। এই পাঁচজন ব্যক্তি তাঁদের সম্প্রদায়ে ব্যাপকভাবে সম্মানিত ছিলেন এবং মানুষ তাঁদের অনুসরণ করত।
যখন এই পাঁচজন মারা গেলেন, তখন শয়তান মানুষের মনে এই ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা ঢেলে দিল — "এই মহান মানুষগুলোর মূর্তি বানাও, তাদের স্মৃতি ধরে রাখো। যেখানে তোমরা বসো, সেখানে তাদের প্রতিকৃতি রাখো — এতে তোমাদের ইবাদতে উৎসাহ বাড়বে।" মানুষ এই পরামর্শ মেনে নিল। প্রথম প্রজন্ম শুধু স্মৃতি রক্ষার জন্যই মূর্তি তৈরি করেছিল।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, নুহ (আ.)-এর কওমের ওই মূর্তিগুলো পরবর্তী প্রজন্মের আরবদের কাছেও পৌঁছে গিয়েছিল। ওয়াদ্দ — কালব গোত্রের, সুওয়া — হুযায়ল গোত্রের, ইয়াগুস — মুরাদ গোত্রের, ইয়াউক — হামদান গোত্রের, নাসর — হিমইয়ার গোত্রের মূর্তিতে পরিণত হয়।
প্রথম প্রজন্মের মানুষ শুধু স্মৃতি রক্ষার জন্য মূর্তি তৈরি করেছিল, তারা এগুলো পূজা করত না। কিন্তু সমস্যা হলো, যখন সেই প্রজন্ম মারা গেল এবং নতুন প্রজন্ম এলো — তখন তারা দেখল তাদের বাপ-দাদারা এই মূর্তিগুলোকে সম্মান দিচ্ছিল। শয়তান এই সুযোগে আবার কুমন্ত্রণা দিল — "তোমাদের পূর্বপুরুষরা এদের উপাসনা করত, এদের কাছে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করত।" এভাবে ধীরে ধীরে ইবাদত শুরু হয়ে গেল।
এই ঘটনাটি মানব ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ভালো উদ্দেশ্য থেকেও যদি সীমা অতিক্রম করা হয়, তাহলে তা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নেককার মানুষদের প্রতি ভালোবাসা ইসলামে স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ভালোবাসা যদি তাদের মূর্তি বানানো বা তাদের কাছে প্রার্থনা করার মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তাহলে তা শিরকে পরিণত হয়।
নুহ (আ.)-এর কওমের ঘটনা — প্রথম মূর্তি পূজার সতর্কতা
নুহ (আ.) ছিলেন আদম (আ.)-এর পরে প্রথম রাসুল যাঁকে আল্লাহ পাঠিয়েছিলেন তাঁর বান্দাদের সঠিক পথে আনার জন্য। তখন মানুষ তাওহিদ ছেড়ে শিরকে ডুবে গিয়েছিল। আল্লাহ নুহ (আ.)কে আদেশ করলেন তাঁর কওমকে সতর্ক করতে।
নুহ (আ.) প্রায় ৯৫০ বছর তাঁর কওমের কাছে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে রাতে ও দিনে, প্রকাশ্যে ও গোপনে, একা এবং দলে দলে মানুষের কাছে গিয়ে আল্লাহর দিকে ডাকলেন। কিন্তু তাঁর কওম কানে আঙুল দিয়ে রইল, কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নিল — তবুও ফিরে আসতে রাজি হলো না।
নুহ (আ.)-এর কওমের নেতারা সাধারণ মানুষকে বলত — "তোমরা তোমাদের দেব-দেবীগুলো ছেড়ো না।" তারা শুধু নিজেরা শিরকে থাকেনি, বরং অন্যদেরও শিরকের মধ্যে আটকে রেখেছিল। এটি ছিল দ্বিগুণ পাপ। পরিশেষে আল্লাহ নুহ (আ.)কে নৌকা তৈরির নির্দেশ দিলেন এবং মহাপ্লাবনে সেই পুরো কওমকে ধ্বংস করে দিলেন।
মহাপ্লাবন — শিরকের পরিণতি
নুহ (আ.) আল্লাহর নির্দেশে বিশাল একটি নৌকা তৈরি করলেন। কওমের লোকেরা তাঁকে ঠাট্টা করত — "মরুভূমিতে নৌকা বানাচ্ছ? পাগল হয়ে গেলে নাকি?" কিন্তু নুহ (আ.) আল্লাহর উপর ভরসা রেখে কাজ চালিয়ে গেলেন। এরপর একদিন বৃষ্টি শুরু হলো। মাটির নিচ থেকেও পানি উঠতে শুরু করল। পুরো পৃথিবী পানিতে ডুবে গেল। যারা আল্লাহকে অস্বীকার করেছিল তারা সবাই ডুবে মরল।
নুহ (আ.)-এর ঘটনা থেকে শিক্ষা
- স্মৃতি রক্ষার নামে মূর্তি তৈরি বিপজ্জনক: সৎ মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকে সীমা অতিক্রম হলে তা শিরকে পরিণত হয়।
- পূর্বপুরুষের অনুসরণ সবসময় সঠিক নয়: তারা যা করতেন তা যদি ভুল হয়, তা মেনে নেওয়া জায়েজ নয়।
- দীর্ঘ দাওয়াতের ধৈর্য: ৯৫০ বছর দাওয়াত দিয়েও হাল না ছাড়া — এটি আমাদের জন্য সবরের অসাধারণ শিক্ষা।
- শিরকের পরিণতি ভয়াবহ: মহাপ্লাবন প্রমাণ করে যে শিরকের পরিণতি এই দুনিয়াতেও ধ্বংস এবং আখিরাতেও।
ইব্রাহিম (আ.) এবং মূর্তি ভাঙার অসাধারণ ঘটনা
ইসলামিক ইতিহাসে মূর্তিবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সাহসী ও শিক্ষণীয় ঘটনাটি হলো ইব্রাহিম (আ.)-এর ঘটনা। আল্লাহ তাআলা তাঁকে "খলিলুল্লাহ" বা আল্লাহর বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি নমরুদের রাজত্বে জন্মগ্রহণ করেছিলেন — সেই নমরুদ যে নিজেকে ইলাহ বলে দাবি করত।
ইব্রাহিম (আ.)-এর বাবার সাথে কথোপকথন
ইব্রাহিম (আ.)-এর বাবা আযর ছিলেন একজন মূর্তি নির্মাতা ও মূর্তি পূজারী। ছোটবেলা থেকেই ইব্রাহিম (আ.) তাঁর বাবাকে জিজ্ঞেস করতেন — এই পাথরগুলোকে পূজা করার কী অর্থ? এগুলো কি শুনতে পায়? দেখতে পায়? কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে? বাবার কাছ থেকে কোনো সন্তোষজনক জবাব না পেয়ে ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর সন্ধানে বের হলেন এবং চিন্তা ও যুক্তির মাধ্যমে তাওহিদের সত্য খুঁজে পেলেন।
মূর্তিঘরে একা ইব্রাহিম (আ.)
একবার ইব্রাহিম (আ.)-এর কওম একটি বড় উৎসবে গেল। তিনি অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে পেছনে রইলেন। সুযোগ পেয়ে তিনি মূর্তিঘরে প্রবেশ করলেন। সেখানে বিভিন্ন আকৃতির, বিভিন্ন মাপের অসংখ্য মূর্তি সাজানো ছিল। তাদের সামনে খাবার রাখা ছিল নৈবেদ্য হিসেবে।
ইব্রাহিম (আ.) ব্যঙ্গ করে বললেন, "তোমরা কি খাচ্ছ না? কী হলো, কথা বলছ না কেন?" তারপর তিনি একটি কুড়াল হাতে নিয়ে একে একে সব মূর্তি ভেঙে ফেললেন — শুধু সবচেয়ে বড় মূর্তিটি রেখে দিলেন এবং কুড়ালটি সেই বড় মূর্তির কাঁধে রেখে দিলেন, যেন মনে হয় সেই বড় মূর্তিই অন্যদের ভেঙেছে।
নমরুদের দরবারে সাহসী বিতর্ক
যখন কওম ফিরে এলো এবং দেখল মূর্তিঘরের ধ্বংসাবশেষ, তারা ইব্রাহিম (আ.)কে ধরে নিয়ে এলো নমরুদের দরবারে। জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলো। ইব্রাহিম (আ.) বললেন, "কেন আমাকে জিজ্ঞেস করছ? ওই বড় মূর্তিটাকে জিজ্ঞেস করো — যদি সে কথা বলতে পারে।"
এই কথা শুনে লোকেরা মাথা নিচু করে ফেলল। তারা ভেতরে ভেতরে বুঝল যে মূর্তি কথা বলতে পারে না। কিন্তু অহংকার তাদের সত্য স্বীকার করতে দিল না। তারা বলল, "তুমি জানো এরা কথা বলতে পারে না।" ইব্রাহিম (আ.) তখন বললেন, "তাহলে আল্লাহকে ছেড়ে এমন কিছুর পূজা কেন করছ যা তোমাদের না উপকার করতে পারে না ক্ষতি করতে পারে?"
ক্রুদ্ধ নমরুদ তখন বিশাল আগুন জ্বালানোর নির্দেশ দিল। ইতিহাসে বলা হয় এই আগুন এত বড় ছিল যে বহু দূর থেকে দেখা যেত। ইব্রাহিম (আ.)কে সেই আগুনে নিক্ষেপ করা হলো। কিন্তু আল্লাহর হুকুমে সেই আগুন ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্য ঠান্ডা ও নিরাপদ হয়ে গেল। এটি ছিল তাওহিদের উপর অটল থাকার অলৌকিক পুরস্কার।
ইব্রাহিম (আ.)-এর ঘটনা থেকে শিক্ষা
- যুক্তিভিত্তিক দাওয়াত: তিনি সরাসরি আক্রমণ না করে বুদ্ধিমত্তার সাথে প্রশ্ন তুলে মূর্তির অসারতা প্রমাণ করেছিলেন।
- সত্যের পথে ত্যাগ: আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ভয়েও তিনি তাওহিদ থেকে সরেননি।
- একা সত্যের উপর থাকার সাহস: পুরো সমাজ যখন মূর্তি পূজা করছিল, তখন একা সত্যের পথে অটল থাকা।
- আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের পুরস্কার: আগুন শীতল হয়ে যাওয়া প্রমাণ করে আল্লাহই একমাত্র রক্ষাকর্তা।
শিরকের ধাপে ধাপে পতন — কীভাবে ভ্রান্তির পথ তৈরি হয়?
ইসলামিক পণ্ডিতরা বলেন, মূর্তি পূজা বা শিরকের সূচনা রাতারাতি হয় না। এটি একটি ধীরে ধীরে চলা প্রক্রিয়া। ইতিহাসের পর্যালোচনা করলে দেখা যায় শিরক সাধারণত কয়েকটি ধাপে আসে।
প্রথম ধাপ — অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন
সৎ ও নেককার মানুষদের প্রতি ভালোবাসা ইসলামে জায়েজ। কিন্তু যখন সেই ভালোবাসা সীমা অতিক্রম করে — তখন তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কবর জিয়ারত করা সুন্নাহ, কিন্তু কবরের কাছে সাজদা করা, সেখানে মানত করা, অথবা মৃত ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়া — এটি শিরকের পথ খুলে দেয়।
দ্বিতীয় ধাপ — ছবি ও মূর্তি নির্মাণ
স্মৃতি রক্ষার নামে ছবি বা প্রতিকৃতি তৈরি করা, তারপর ধীরে ধীরে সেগুলোকে পবিত্র মনে করা। নুহ (আ.)-এর কওমে এটিই হয়েছিল। প্রথম প্রজন্ম শুধু স্মৃতি রক্ষা করেছিল, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম পূজা শুরু করে দিল।
তৃতীয় ধাপ — মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার
"আমরা তো আল্লাহকেই ডাকছি, শুধু এদের মাধ্যমে" — এই যুক্তি দিয়ে শিরক বৈধ করার চেষ্টা। কিন্তু কুরআন স্পষ্ট বলেছে, এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
চতুর্থ ধাপ — প্রকাশ্য উপাসনা
এই ধাপে এসে মানুষ সরাসরি মূর্তির কাছে প্রার্থনা করে, কান্নাকাটি করে, নজর-নিয়াজ দেয় এবং বিপদে পড়লে মূর্তির দিকে ছুটে যায়। এটি খোলামেলা শিরক যা থেকে বের হওয়ার জন্য তওবার প্রয়োজন।
শয়তান কখনও সরাসরি বলে না "শিরক করো"। সে সবসময় সুন্দর সুন্দর যুক্তি দিয়ে, ধীরে ধীরে মানুষকে শিরকের দিকে নিয়ে যায়। তাই প্রতিটি পদক্ষেপে সতর্ক থাকা জরুরি।
কুরআন ও হাদিসের সতর্কবার্তা
আল্লাহ তাআলা কুরআনে শিরকের বিরুদ্ধে বারবার এবং অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। শিরককে তিনি সবচেয়ে বড় জুলুম বলে ঘোষণা করেছেন। কোনো মানুষ যদি শিরক নিয়ে মারা যায় এবং তওবা না করে, তাহলে তার জান্নাতে প্রবেশ হারাম।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ সম্পর্কে জানাব না?" সাহাবিরা বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন, "আল্লাহর সাথে শিরক করা এবং পিতামাতার অবাধ্য হওয়া।"
নবিজি (সা.) মৃত্যুশয্যায় বলেছিলেন, "আল্লাহর লানত সেই জাতির উপর যারা তাদের নবিদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে।" এই বলে তিনি উম্মতকে তাঁর নিজের কবরকেও পূজাস্থানে পরিণত করা থেকে সতর্ক করেছিলেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) চাননি তাঁর উম্মত তাঁর ক্ষেত্রেও একই ভুল করুক যা আগের জাতিগুলো তাদের নবিদের ক্ষেত্রে করেছিল। এজন্যই তিনি স্পষ্টভাবে তাঁর কবরকে মসজিদ বানাতে নিষেধ করে গেছেন।
বিশ্বস্ত ইসলামিক রেফারেন্স পড়ুন
এই ঘটনাগুলো থেকে আমাদের শিক্ষা
ইতিহাসের এই শিক্ষণীয় ঘটনাগুলো শুধু জানার জন্য নয়, এগুলো থেকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আধুনিক যুগে শিরক শুধু মূর্তি পূজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় — এটি বিভিন্ন আধুনিক রূপে উপস্থিত।
আধুনিক যুগে শিরকের নতুন রূপ
আজকের যুগে অনেকে জ্যোতিষ, তাবিজ-কবচ, ভাগ্য গণনা, ওঝা-বৈদ্যের কাছে যাওয়া ইত্যাদিকে নিরীহ মনে করেন। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে যদি এগুলোতে বিশ্বাস করা হয় যে এই জিনিসগুলো নিজেই উপকার বা ক্ষতি করতে পারে, তাহলে তা শিরকের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি গণকের কাছে গেল এবং সে যা বলল তা বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মদের উপর যা নাজিল হয়েছে তা অস্বীকার করল।"
তাওহিদ মজবুত রাখার উপায়
শিরক থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাওহিদের জ্ঞান অর্জন করা। আল্লাহর নাম ও গুণাবলি সম্পর্কে গভীরভাবে জানা, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ বোঝা, এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ মেনে চলা। পরিবারের সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই তাওহিদ শেখানো উচিত — ঠিক যেভাবে লুকমান (আ.) তাঁর ছেলেকে শিক্ষা দিয়েছিলেন।
তাওহিদ শক্তিশালী রাখার ব্যবহারিক পদ্ধতি
- দৈনিক কুরআন তিলাওয়াত: অর্থসহ কুরআন পড়া তাওহিদের বোঝাপড়া গভীর করে এবং ঈমান মজবুত করে।
- সকাল-সন্ধ্যার জিকর: "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বারবার স্মরণ করা এবং সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া পড়া।
- সন্দেহজনক আমল থেকে দূরে থাকা: যেকোনো কাজ যা শিরকের দিকে নিয়ে যেতে পারে তা এড়িয়ে চলা।
- বিশ্বস্ত আলেমদের কাছ থেকে শেখা: ইসলামিক জ্ঞান সঠিক সূত্র থেকে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
- শিরক থেকে পানাহ চাওয়া: প্রতিদিন দোয়া করা — "আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা আন উশরিকা বিকা শাইআন আ'লামুহু ওয়া আসতাগফিরুকা লিমা লা আ'লাম।"
আরও পড়ুন এই বিষয়ে
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
উপসংহার
মূর্তি তৈরির ইতিহাস আমাদের শেখায় যে ভ্রান্তির পথ সবসময় একটি ছোট পদক্ষেপ দিয়ে শুরু হয়। নেক মানুষের স্মৃতি রক্ষা, পূর্বপুরুষের অনুসরণ, বা "মাধ্যম" হিসেবে ব্যবহারের অজুহাত — এই সব সুন্দর সুন্দর যুক্তি দিয়ে শয়তান মানুষকে শিরকের দিকে নিয়ে যায়।
নুহ (আ.) ৯৫০ বছর দাওয়াত দিয়েছেন, ইব্রাহিম (আ.) আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন — শুধুমাত্র তাওহিদের সত্যটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে। তাঁদের জীবন আমাদের দেখায় যে তাওহিদের উপর অটল থাকাই হলো সাফল্যের পথ। আমাদের দায়িত্ব হলো তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং নিজেদের, পরিবারের ও সমাজের তাওহিদ রক্ষা করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে শিরক থেকে হেফাজত করুন এবং তাওহিদের উপর জীবন ও মৃত্যু দান করুন। আমিন।

Please do not enter any spam link in the comment box. ConversionConversion EmoticonEmoticon