মুসা (আ.) ও খিদর (আ.)–এর বিদায়
রহস্যময় বিচ্ছেদের শেষ দৃশ্য, নীরব শিক্ষা ও আল্লাহর হিকমাহ
ভূমিকা
কিছু বিদায় থাকে, যা চোখে জল আনে।
কিছু বিদায় থাকে, যা মনে প্রশ্ন তোলে।
আর কিছু বিদায় এমন, যা মানুষকে আজীবন ভাবতে শেখায়।
নবী মুসা (আ.) ও আল্লাহর বিশেষ বান্দা খিদর (আ.)–এর বিদায় ঠিক তেমনই এক ঘটনা। এটি কেবল দুই ব্যক্তির আলাদা হয়ে যাওয়া নয়; বরং এটি মানবিক জ্ঞান ও ঐশী হিকমাহর মাঝের সীমারেখা স্পষ্ট করে দেয়।
এই বিদায়ের মুহূর্তে নেই কোনো অভিযোগ, নেই কোনো দীর্ঘ সংলাপ। আছে শুধু একটি বাক্য—
“এটাই আমাদের মধ্যে বিচ্ছেদের সময়।”
এই একটি বাক্যের ভেতর লুকিয়ে আছে বহু বছরের চিন্তার খোরাক।
সাক্ষাতের পেছনের পটভূমি
মুসা (আ.) ছিলেন একজন মহান নবী, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ বনী ইসরাইলকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তিনি তাওরাতপ্রাপ্ত, শরিয়তের বাহক এবং মানুষের সামনে সত্যের পথপ্রদর্শক।
একদিন আল্লাহ তাঁকে জানালেন—
পৃথিবীতে এমন একজন বান্দা আছেন, যাঁকে এমন জ্ঞান দেওয়া হয়েছে যা মুসা (আ.) জানেন না।
এই সংবাদ মুসা (আ.)–এর অন্তরে বিনয় সৃষ্টি করল। তিনি শিখতে চাইলেন, জানতে চাইলেন। এখানেই শুরু হলো সেই ঐতিহাসিক যাত্রা—দুই সমুদ্রের সংযোগস্থলের দিকে।
মুসা (আ.) ও খিদর (আ.)–এর প্রথম সাক্ষাৎ
খিদর (আ.)–এর সঙ্গে সাক্ষাৎ
দীর্ঘ সফরের পর অবশেষে সেই রহস্যময় বান্দার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। মুসা (আ.) ভদ্রতা ও বিনয়ের সঙ্গে বলেন—
“আমি কি আপনার সঙ্গে থাকতে পারি, যাতে আপনি আমাকে সেই জ্ঞান শিক্ষা দেন, যা আপনাকে আল্লাহ দান করেছেন?”
খিদর (আ.) উত্তরে বলেন—
“তুমি আমার সঙ্গে ধৈর্য রাখতে পারবে না।”
এই কথাটিই ছিল ভবিষ্যৎ বিচ্ছেদের প্রথম ইঙ্গিত।
শর্ত ও প্রতিশ্রুতি
খিদর (আ.) একটি শর্ত দেন—
মুসা (আ.) কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করবেন না, যতক্ষণ না তিনি নিজে ব্যাখ্যা দেন।
মুসা (আ.) প্রতিশ্রুতি দেন—
“ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।”
কিন্তু মানুষ প্রতিশ্রুতি দেয় বর্তমান বোঝাপড়া দিয়ে, আর আল্লাহ পরীক্ষা নেন ভবিষ্যতের বাস্তবতায়।
প্রথম ঘটনা: নৌকা ফুটো করা
তাঁরা একটি দরিদ্র মানুষের নৌকায় উঠলেন। হঠাৎ খিদর (আ.) সেই নৌকায় ছিদ্র করে দিলেন।
মুসা (আ.) বিস্মিত ও ব্যথিত হয়ে বললেন—
“আপনি কি মানুষগুলোকে ডুবিয়ে মারতে চান?”
খিদর (আ.) কিছু বললেন না।
পরে জানা গেল—এক অত্যাচারী শাসক ভালো নৌকা জোরপূর্বক দখল করত। নৌকাটি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটি রক্ষা পেল।
এই ঘটনা শেখায়—
অনেক সময় যে ক্ষতিকে আমরা অভিশাপ মনে করি, সেটিই হয় আল্লাহর রহমত।
দ্বিতীয় ঘটনা: শিশুকে হত্যা
এই ঘটনা ছিল সবচেয়ে কঠিন। খিদর (আ.) এক শিশুকে হত্যা করলেন।
মুসা (আ.) আর চুপ থাকতে পারলেন না। তাঁর কণ্ঠে ছিল কষ্ট, প্রতিবাদ আর বিস্ময়।
পরে ব্যাখ্যা এলো—
এই শিশু বড় হয়ে তার বাবা-মাকে কুফর ও সীমালঙ্ঘনের পথে নিয়ে যেত। আল্লাহ তাঁদের পরিবর্তে উত্তম সন্তান দিতে চেয়েছিলেন।
এখানে স্পষ্ট হয়—
মানুষ বর্তমান দেখে বিচার করে, আর আল্লাহ ভবিষ্যৎ জানেন।
তৃতীয় ঘটনা: দেয়াল মেরামত
এক কৃপণ জনপদে তাঁরা আশ্রয় চাইলেন, কিন্তু কেউ সহযোগিতা করল না। তবুও খিদর (আ.) একটি ভাঙা দেয়াল ঠিক করে দিলেন।
মুসা (আ.) বললেন—
“আপনি চাইলে এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক নিতে পারতেন।”
এখানেই শেষ হলো যাত্রা।
ধৈর্য ও তাকদির: ইসলামি ব্যাখ্যা
বিদায়ের ঘোষণা
খিদর (আ.) শান্ত কণ্ঠে বললেন—
“এটাই আমাদের মধ্যে বিচ্ছেদের সময়।”
এরপর তিনি তিনটি ঘটনার ব্যাখ্যা দিলেন।
এই বিদায়ে নেই কোনো রাগ, নেই কোনো কঠোরতা।
শুধু বাস্তবতার স্বীকৃতি।
কেন এই বিচ্ছেদ অনিবার্য ছিল
এই বিচ্ছেদ ঘটেছিল কারণ—
-
মুসা (আ.) কাজ করতেন শরিয়তের প্রকাশ্য বিধান অনুযায়ী
-
খিদর (আ.) কাজ করতেন আল্লাহর বিশেষ নির্দেশে
-
প্রকাশ্য আইন ও গোপন হিকমাহ সব সময় একই পথে চলে না
এটি কোনো ব্যর্থতা নয়, বরং দায়িত্বের সীমা।
বিদায়ের নীরবতা ও তাৎপর্য
খিদর (আ.) চলে গেলেন।
মুসা (আ.) রইলেন ভাবনায়।
এই নীরবতা আমাদের শেখায়—
সব প্রশ্নের উত্তর মানুষের জন্য নয়,
আর সব জ্ঞান মানুষের বহন করার উপযোগী নয়।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি
আলেমরা বলেন—
-
মুসা (আ.) প্রতীক প্রকাশ্য জ্ঞানের
-
খিদর (আ.) প্রতীক অন্তর্দৃষ্টির
এই দুই জ্ঞান একে অপরের বিরোধী নয়, কিন্তু তাদের ভূমিকা আলাদা।
আধুনিক জীবনে এই ঘটনার প্রাসঙ্গিকতা
আজ আমরা যখন জীবনে কোনো অপ্রত্যাশিত কষ্টে পড়ি, তখন এই গল্প আমাদের বলে—
-
সব কষ্ট শাস্তি নয়
-
সব দেরি অকল্যাণ নয়
-
সব না-পাওয়া ক্ষতি নয়
বিশ্বাস মানে প্রশ্নহীন অন্ধতা নয়, বরং ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা।
উপসংহার
মুসা (আ.) ও খিদর (আ.)–এর বিদায় আমাদের শেখায়—
আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের বোঝার সীমার বাইরে হলেও,
তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত কল্যাণকর।
এই বিদায় তাই কেবল শেষ নয়,
বরং উপলব্ধির শুরু।
FAQ: ১০টি বিস্তৃত প্রশ্নোত্তর
১. খিদর (আ.) কি নবী ছিলেন?
এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
২. মুসা (আ.) কেন প্রশ্ন করেছিলেন?
কারণ তিনি শরিয়তের প্রকাশ্য আইন অনুযায়ী বিচার করছিলেন।
৩. নৌকা ফুটো করা কি অন্যায় ছিল?
না, এটি বড় বিপদ থেকে রক্ষার উপায় ছিল।
৪. শিশুকে হত্যা কেন করা হয়েছিল?
আল্লাহর বিশেষ জ্ঞানের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য।
৫. দেয়াল মেরামতের শিক্ষা কী?
নির্লোভ সেবার গুরুত্ব।
৬. এই বিদায় কি কষ্টদায়ক ছিল?
মানবিকভাবে হ্যাঁ, কিন্তু আধ্যাত্মিকভাবে তা ছিল প্রয়োজনীয়।
৭. এই ঘটনা কোথায় বর্ণিত?
সূরা কাহফ, আয়াত ৬০–৮২।
৮. আজকের জীবনে এর প্রয়োগ কী?
ধৈর্য রাখা ও আল্লাহর উপর ভরসা করা।
৯. মুসা (আ.) কি ব্যর্থ হয়েছিলেন?
না, তিনি নিজের সীমা চিনতে পেরেছিলেন।
১০. এই গল্পের মূল শিক্ষা কী?
আল্লাহর হিকমাহ মানুষের জ্ঞানের ঊর্ধ্বে।
_%E0%A6%93_%E0%A6%96%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A6%B0_(%E0%A6%86.)_%E0%A6%8F%E0%A6%B0_%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%AF%E0%A6%BC.jpeg)
Please do not enter any spam link in the comment box. ConversionConversion EmoticonEmoticon