খিদির (আ.) কি এখনো জীবিত?
কোন কোন আলেম বিশ্বাস করেন? গোপন জ্ঞানের রহস্য ও ইসলামি বিশ্লেষণ
ইসলামি ইতিহাস ও আকিদার জগতে এমন কিছু চরিত্র আছেন, যাঁদের নিয়ে প্রশ্ন, কৌতূহল ও বিতর্ক শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলমান। হযরত খিদির (আ.) ঠিক তেমনই এক রহস্যময় সত্তা। কুরআনে তাঁর নাম সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও সূরা আল-কাহফে বর্ণিত “আল্লাহর এক বান্দা”-কে অধিকাংশ মুফাসসির খিদির (আ.) হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন।
সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো— খিদির (আ.) কি এখনো জীবিত?
আর যদি জীবিত হন, তাহলে কীভাবে? কেন? আর কোন কোন আলেম এই মত পোষণ করেছেন?
এই প্রবন্ধে আমরা কুরআন, হাদিস, তাফসির, আকিদা ও আলেমদের মতামতের আলোকে বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করব।
১. খিদির (আ.)—তিনি কে?
সূরা আল-কাহফ (১৮:৬০–৮২)-এ বর্ণিত সেই ব্যক্তির পরিচয় দেওয়া হয়েছে এভাবে—
“আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে এক বান্দাকে পেলাম, যাকে আমি আমার পক্ষ থেকে রহমত দান করেছিলাম এবং আমার পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছিলাম।”
এই “বিশেষ জ্ঞান”-কেই বলা হয় ইলমে লাদুন্নি—আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি প্রদত্ত জ্ঞান, যা সাধারণ নবী বা আলেমদের অর্জিত জ্ঞানের বাইরে।
অধিকাংশ আলেম একমত যে—
-
তিনি একজন বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন বান্দা
-
নবী ছিলেন কি না—এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে
-
তবে তাঁর জ্ঞান ছিল আল্লাহপ্রদত্ত, অর্জিত নয়
২. কুরআনে খিদির (আ.)-এর জীবিত থাকার ইঙ্গিত আছে কি?
কুরআন খিদির (আ.) জীবিত না মৃত—এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা দেয়নি। এখানেই মূল বিতর্কের সূত্রপাত।
তাঁর জীবিত থাকার পক্ষে যারা কথা বলেন, তারা সাধারণত কুরআনের এই বিষয়গুলো তুলে ধরেন—
-
আল্লাহ তাঁকে “বিশেষ রহমত” ও “বিশেষ জ্ঞান” দান করেছিলেন
-
তিনি মুসা (আ.)-এর মতো একজন রাসূলকে শিক্ষা দিয়েছেন
-
তাঁর কাজগুলো ছিল ভবিষ্যৎ-নির্ভর (ছেলেটিকে হত্যা, দেয়াল নির্মাণ)
তাদের মতে, এমন জ্ঞান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে আল্লাহ দীর্ঘ জীবন দিতে পারেন—এটি অসম্ভব নয়।
৩. খিদির (আ.) কি নবী ছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আলেমদের মাজহাব ও আকিদাগত ব্যাখ্যার ওপর।
নবী ছিলেন—এই মতের পক্ষে যুক্তি:
-
তিনি ওহি-সদৃশ জ্ঞান পেতেন
-
তাঁর কাজগুলো শরিয়তের বাহ্যিক নিয়মের বাইরে ছিল
-
তিনি বলেন: “আমি নিজের ইচ্ছায় এসব করিনি”
ইমাম ইবনু হাজার, ইমাম কুরতুবি প্রমুখ এই মতকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন।
নবী ছিলেন না—এই মতের পক্ষে যুক্তি:
-
কুরআনে তাঁকে স্পষ্টভাবে নবী বলা হয়নি
-
তিনি ছিলেন একজন ওলি, কিন্তু নবী নন
ইমাম নববি ও অনেক হাদিস বিশারদ এই মত পোষণ করেন।
৪. খিদির (আ.) কি এখনো জীবিত—হ্যাঁ বলার পক্ষে আলেমরা
নিম্নোক্ত আলেমরা খিদির (আ.) জীবিত আছেন—এই মতের প্রতি ঝুঁকেছেন বা সমর্থন করেছেন—
-
ইমাম নববি (রহ.)
-
ইমাম ইবনু সালাহ
-
ইমাম সুয়ুতি
-
ইমাম কুরতুবি (আংশিকভাবে)
-
বহু সুফি আলেম ও আরিফ বিল্লাহগণ
তাঁদের যুক্তি সংক্ষেপে—
-
খিদির (আ.)-এর মৃত্যু সম্পর্কে কোনো সহিহ দলিল নেই
-
আল্লাহ ইলিয়াস (আ.) ও ঈসা (আ.)-কে দীর্ঘ জীবন দিয়েছেন
-
বহু নেককার ব্যক্তির সাক্ষ্য আছে যে তাঁরা খিদির (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন
৫. জীবিত নন—এই মতের পক্ষে আলেমরা
অন্যদিকে শক্তিশালী একটি দল মনে করেন—খিদির (আ.) এখন জীবিত নন।
এই দলে রয়েছেন—
-
ইমাম বুখারি (ইঙ্গিতপূর্ণভাবে)
-
ইমাম মুসলিম
-
ইমাম ইবনু তাইমিয়া
-
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম
-
আধুনিক সালাফি আলেমদের বড় অংশ
তাঁদের মূল দলিল—
(ক) হাদিসের দলিল
রাসূল (সা.) বলেছেন:
“আজ পৃথিবীতে যারা জীবিত আছে, একশো বছর পর তাদের কেউ জীবিত থাকবে না।”
যদি খিদির (আ.) তখন জীবিত থাকতেন, তবে এই হাদিসের ব্যতিক্রম হতেন—কিন্তু এর কোনো প্রমাণ নেই।
(খ) আকিদাগত যুক্তি
নবী মুহাম্মদ (সা.) শেষ নবী।
যদি খিদির (আ.) জীবিত থাকতেন, তবে তাঁর উম্মত হওয়া বা তাঁর কাছে বাইআত করা জরুরি হতো।
৬. সুফিবাদের দৃষ্টিতে খিদির (আ.)
সুফি ধারায় খিদির (আ.) এক অনন্য মর্যাদার অধিকারী।
তাঁকে বলা হয়—
-
ওলিদের শিক্ষক
-
বাতেনি জ্ঞানের ধারক
-
আত্মিক পথপ্রদর্শক
অনেক সুফি শায়খ দাবি করেন, তাঁরা স্বপ্নে বা জাগ্রত অবস্থায় খিদির (আ.)-এর সাক্ষাৎ পেয়েছেন। তবে ফিকহ ও আকিদার দৃষ্টিতে এগুলো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, শরিয়তের দলিল নয়।
৭. গোপন জ্ঞান (ইলমে লাদুন্নি) কী?
খিদির (আ.)-এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এই গোপন জ্ঞান।
ইলমে লাদুন্নি মানে—
-
যা কিতাব পড়ে শেখা যায় না
-
যা যুক্তি দিয়ে পুরোপুরি বোঝা যায় না
-
যা আল্লাহ সরাসরি যাকে চান তাঁকে দেন
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
এই জ্ঞান শরিয়তের বিরুদ্ধে যেতে পারে না।
৮. খিদির (আ.)-এর কাহিনি আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
-
সব জ্ঞান আমরা বুঝতে পারি না
-
আল্লাহর সিদ্ধান্ত সর্বদা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত
-
ধৈর্য ছাড়া হিকমাহ বোঝা যায় না
-
বাহ্যিক ক্ষতি অনেক সময় অন্তর্নিহিত কল্যাণ বহন করে
৯. তাহলে সঠিক মত কোনটি?
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর মূলনীতি হলো—
“যে বিষয়ে কুরআন ও সহিহ হাদিসে স্পষ্ট প্রমাণ নেই, সেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না।”
অতএব—
-
খিদির (আ.) জীবিত—এটি সম্ভাব্য মত
-
খিদির (আ.) মৃত—এটিও সম্ভাব্য মত
-
কাউকে কাফির বা ভ্রান্ত বলা যাবে না
FAQ: ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর
১. খিদির (আ.)-এর নাম কুরআনে আছে কি?
না, নাম নেই; তবে তাঁর ঘটনা রয়েছে।
২. তিনি কি নবী ছিলেন?
এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে।
৩. খিদির (আ.) কি এখনো জীবিত?
এটি মতভেদপূর্ণ বিষয়; নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
৪. তাঁকে কি আজ দেখা যেতে পারে?
শরিয়তিভাবে প্রমাণিত নয়।
৫. সুফিরা কেন তাঁকে জীবিত বলেন?
আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার কারণে।
৬. ইবনু তাইমিয়া কী বলেন?
তিনি বলেন—খিদির (আ.) জীবিত নন।
৭. ইলমে লাদুন্নি কি সবার জন্য?
না, এটি আল্লাহর বিশেষ দান।
৮. গোপন জ্ঞান কি শরিয়তের বাইরে?
না, কখনোই না।
৯. খিদির (আ.) কি মাহদির সঙ্গে থাকবেন?
এর কোনো সহিহ দলিল নেই।
১০. তিনি কি ফেরেশতা ছিলেন?
না, তিনি মানুষ ছিলেন—এটাই গ্রহণযোগ্য মত।
১১. তাঁর মৃত্যুর প্রমাণ আছে?
সরাসরি প্রমাণ নেই, তবে সাধারণ হাদিসের আওতায় পড়েন।
১২. তাঁর কাহিনি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আল্লাহর হিকমাহ বোঝার জন্য।
১৩. সাধারণ মানুষ কি ইলমে লাদুন্নি পেতে পারে?
আল্লাহ চাইলে দিতে পারেন, তবে তা দাবি করা যায় না।
১৪. এ বিষয়ে ঝগড়া করা কি ঠিক?
না, এটি ইখতিলাফি মাসআলা।
১৫. আমাদের করণীয় কী?
কুরআন, সুন্নাহ ও বিনয়ের পথে থাকা।
উপসংহার
খিদির (আ.)-এর জীবন ও মর্যাদা আমাদের শেখায়—
সব সত্য চোখে দেখা যায় না,
সব হিকমাহ সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় না,
আর আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের ধারণার চেয়েও গভীর।
তিনি জীবিত না মৃত—এটি জানার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো,
তাঁর কাহিনি থেকে শিক্ষা নেওয়া।
_%E0%A6%95%E0%A6%BF_%E0%A6%8F%E0%A6%96%E0%A6%A8%E0%A7%8B_%E0%A6%9C%E0%A7%80%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A4.jpeg)
Please do not enter any spam link in the comment box. ConversionConversion EmoticonEmoticon