মৃত্যুদূতকে যিনি আঘাত করেছিলেন - মুসা (আঃ) এর অবিশ্বাস্য ঘটনা

 


মৃত্যুদূতকে_যিনি_আঘাত_করেছিলেন

মৃত্যুদূতকে যিনি আঘাত করেছিলেন - মুসা (আঃ) এর অবিশ্বাস্য ঘটনা

মেটা ডিসক্রিপশন: হযরত মুসা (আঃ) এবং মৃত্যুদূত মালাকুল মউতের মধ্যে সংঘটিত অবিশ্বাস্য ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন। সহীহ হাদীসের আলোকে এই ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ ও শিক্ষা।


ভূমিকা

ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে যা আমাদের ঈমান ও আক্বীদাকে আরো মজবুত করে। তেমনই একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা হলো হযরত মুসা (আলাইহিস সালাম) এবং মৃত্যুদূত মালাকুল মউতের মধ্যে সংঘটিত ঘটনা। এই ঘটনাটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে এবং এর মধ্যে রয়েছে গভীর শিক্ষা ও তাৎপর্য।

অনেকেই এই ঘটনা সম্পর্কে শুনে থাকেন কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ ও তাৎপর্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা সহীহ হাদীসের আলোকে এই ঘটনার সম্পূর্ণ বিবরণ, এর পেছনের কারণ, এবং আমাদের জন্য এতে কী শিক্ষা রয়েছে তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো।

১. ঘটনার মূল বর্ণনা - হাদীসের আলোকে

১.১ সহীহ হাদীসে বর্ণিত ঘটনা

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

"মৃত্যুর ফেরেশতা মুসা (আঃ) এর কাছে আসলেন মানুষের আকৃতিতে। মুসা (আঃ) তাঁকে এমন জোরে চপেটাঘাত করলেন যে, তাঁর চোখ উপড়ে গেল। অতঃপর ফেরেশতা আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে বললেন: আপনি আমাকে এমন এক বান্দার কাছে পাঠিয়েছেন যে মৃত্যুকে পছন্দ করে না এবং সে আমার চোখ উপড়ে ফেলেছে।"

(সহীহ বুখারী: ১৩৩৯, সহীহ মুসলিম: ২৩৭২)

এই হাদীসটি সহীহ বুখারী এবং সহীহ মুসলিম উভয় গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, যা এর সত্যতার সর্বোচ্চ প্রমাণ। ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁদের গ্রন্থে শুধুমাত্র সর্বোচ্চ মানের সহীহ হাদীসই সংকলন করেছেন।

১.২ হাদীসের বিশুদ্ধতা

এই হাদীসটির সনদ অত্যন্ত মজবুত এবং সকল হাদীস বিশেষজ্ঞ এর সত্যতা স্বীকার করেছেন। ইমাম নববী (রহ.), ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) সহ বড় বড় মুহাদ্দিসগণ এই হাদীস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং এর শিক্ষা বর্ণনা করেছেন।

২. ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ

২.১ মুসা (আঃ) এর পরিচয়

হযরত মুসা (আঃ) ছিলেন বনী ইসরাঈলের প্রতি প্রেরিত আল্লাহর অন্যতম মহান নবী। তিনি উলুল আযম পাঁচ নবীর একজন - যাঁরা হলেন: নূহ (আঃ), ইবরাহীম (আঃ), মুসা (আঃ), ঈসা (আঃ) এবং মুহাম্মাদ (সাঃ)।

মুসা (আঃ) এর জীবনের কিছু বিশেষত্ব:

  • তিনি মিশরের ফেরাউনের নিকট প্রেরিত হয়েছিলেন
  • তাওরাত কিতাব তাঁর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল
  • তিনি আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন (কালীমুল্লাহ)
  • তিনি বনী ইসরাঈলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্ত করেছিলেন
  • সমুদ্র বিভক্ত হওয়া সহ অসংখ্য মু'জিযা তাঁর হাতে প্রকাশ পেয়েছিল

২.২ প্রথম সাক্ষাৎ - আকস্মিক প্রতিক্রিয়া

হযরত মুসা (আঃ) যখন বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হলেন, তখন একদিন হঠাৎ করে মালাকুল মউত (ফেরেশতা আযরাঈল) মানুষের আকৃতিতে তাঁর সামনে হাজির হলেন। মুসা (আঃ) প্রথমে বুঝতে পারলেন না যে তিনি কে এবং কী উদ্দেশ্যে এসেছেন।

কেন মুসা (আঃ) আঘাত করলেন?

বিজ্ঞ আলেমগণ এর বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করেছেন:

১. আত্মরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া: মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হলো অপরিচিত কেউ হঠাৎ ঘরে প্রবেশ করলে আত্মরক্ষার চেষ্টা করা। মুসা (আঃ) এটিকে একজন অনধিকার প্রবেশকারী মনে করে প্রতিরোধ করেছিলেন।

২. অনুমতি ছাড়া প্রবেশ: ইসলামে অনুমতি ছাড়া অন্যের ঘরে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ। মুসা (আঃ) ভেবেছিলেন এটি একটি অন্যায় কাজ এবং তিনি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিলেন।

৩. মৃত্যুদূত নিজেকে পরিচয় দেননি: ফেরেশতা প্রথমে তাঁর পরিচয় প্রকাশ করেননি, ফলে মুসা (আঃ) জানতেন না যে তিনি কে।

৪. জীবনের প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহ: মানুষ মাত্রই জীবনকে ভালোবাসে এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করে - এটি আল্লাহ প্রদত্ত স্বাভাবিক প্রকৃতি।

২.৩ মৃত্যুদূতের আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন

আঘাতের তীব্রতা এতটাই ছিল যে মালাকুল মউতের একটি চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেল। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ্য - ফেরেশতাগণ নূরের তৈরি এবং তাঁদের প্রকৃত ক্ষতি হয় না, তবে তাঁরা যে আকৃতি ধারণ করেন সেই আকৃতিতে ক্ষতির প্রভাব পড়ে।

মালাকুল মউত আল্লাহর দরবারে ফিরে গিয়ে বললেন:

"হে আল্লাহ! আপনি আমাকে এমন এক বান্দার কাছে পাঠিয়েছেন যে মৃত্যুকে মোটেও পছন্দ করে না এবং সে আমার চোখ উপড়ে ফেলেছে।"

এখানে লক্ষণীয় যে মালাকুল মউত কোনো অভিযোগ করেননি বরং শুধুমাত্র পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন। এটি ফেরেশতাদের আদব ও শিষ্টাচারের প্রমাণ।

২.৪ আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ

আল্লাহ তা'আলা মুসা (আঃ) এর প্রতি তাঁর বিশেষ মর্যাদার কারণে মালাকুল মউতকে পুনরায় পাঠালেন। এবারের নির্দেশ ছিল ভিন্ন এবং বিশেষ।

আল্লাহ তা'আলা বললেন:

"তুমি পুনরায় তার কাছে যাও এবং তাকে বলো যে, যদি সে জীবন চায় তাহলে তার হাত একটি ষাঁড়ের পিঠে রাখুক। তার হাতের নিচে যতগুলি পশম/লোম থাকবে, প্রতিটি পশমের বিনিময়ে তাকে এক বছর করে জীবন দেওয়া হবে।"

এই প্রস্তাব থেকে বোঝা যায়:

  • মুসা (আঃ) এর বিশেষ মর্যাদা ছিল আল্লাহর কাছে
  • আল্লাহ তাঁকে আরো দীর্ঘ জীবনের সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন
  • একটি ষাঁড়ের পিঠে হাজারের বেশি পশম থাকতে পারে, অর্থাৎ হাজার বছরের বেশি জীবন!

২.৫ মুসা (আঃ) এর জ্ঞানগর্ভ প্রশ্ন

মালাকুল মউত যখন পুনরায় এই বিশেষ প্রস্তাব নিয়ে মুসা (আঃ) এর কাছে গেলেন, তখন মুসা (আঃ) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জ্ঞানগর্ভ প্রশ্ন করলেন:

"তারপর কী হবে?"

এই সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর প্রজ্ঞা। মুসা (আঃ) জানতে চাইলেন যে এতগুলো বছর বাঁচার পরে শেষ পরিণতি কী হবে।

মালাকুল মউত উত্তর দিলেন: "তারপরও মৃত্যু আসবে।"

২.৬ মুসা (আঃ) এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

এই উত্তর শুনে মুসা (আঃ) এর চেহারায় প্রশান্তি ফুটে উঠলো। তিনি বুঝলেন যে মৃত্যু একটি অবধারিত সত্য। আজ হোক বা হাজার বছর পরে হোক, তাঁকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে।

তখন মুসা (আঃ) বললেন:

"তাহলে এখনই হোক।"

এটি ছিল এক মহান নবীর অসাধারণ সিদ্ধান্ত। তিনি দুনিয়ার হাজার বছরের জীবনের চেয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যকে বেছে নিলেন।

২.৭ শেষ ইচ্ছা - বাইতুল মাকদিসের নিকটে

মুসা (আঃ) তাঁর জীবনের শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তিনি দোয়া করলেন:

"হে আল্লাহ! আমাকে পবিত্র ভূমি (বাইতুল মাকদিস) থেকে এক পাথর নিক্ষেপ দূরত্বের মধ্যে মৃত্যু দান করুন।"

আল্লাহ তা'আলা তাঁর এই দোয়া কবুল করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

"আল্লাহর কসম! যদি আমি সেখানে থাকতাম, তাহলে আমি তোমাদেরকে রাস্তার পাশে লাল টিলার কাছে তাঁর কবর দেখাতাম।"

(সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

৩. ঘটনার গভীর তাৎপর্য ও শিক্ষা

৩.১ নবীদের বিশেষ মর্যাদা

এই ঘটনা থেকে আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে আল্লাহর নবীগণের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যখন মৃত্যুদূত আসেন, তখন কোনো প্রতিরোধের সুযোগ থাকে না এবং নির্ধারিত সময়ে রূহ কবজ করা হয়।

কিন্তু মুসা (আঃ) এর ক্ষেত্রে:

  • তিনি প্রথম আগমনে প্রতিরোধ করতে পেরেছিলেন
  • আল্লাহ তাঁকে দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছিলেন
  • তাঁকে হাজার বছরের জীবনের অফার দেওয়া হয়েছিল
  • তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী মৃত্যুর স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল

৩.২ মৃত্যু - একটি অবধারিত সত্য

এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মৃত্যু একটি অবধারিত সত্য যা থেকে কেউ পালাতে পারবে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"প্রতিটি প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর আমার কাছেই তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে।"

(সূরা আল-আনকাবুত: ৫৭) - আয়াত দেখুন

আরো বলা হয়েছে:

"বলুন, তোমাদের থেকে যে মৃত্যু পলায়ন করছো তা অবশ্যই তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করবে।"

(সূরা আল-জুমুআ: ৮) - আয়াত দেখুন

মুসা (আঃ) এর মতো মহান নবী, যিনি:

  • আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলেছেন
  • তাওরাত লাভ করেছেন
  • অসংখ্য মু'জিযার অধিকারী ছিলেন
  • উলুল আযম নবীদের একজন ছিলেন

তিনিও মৃত্যুকে এড়াতে পারেননি। তাহলে আমরা সাধারণ মানুষেরা কীভাবে মৃত্যু এড়াতে পারবো?

৩.৩ দুনিয়ার জীবনের প্রকৃত মূল্য

মুসা (আঃ) যখন হাজার বছরের জীবনের প্রস্তাব পেলেন এবং জানলেন তারপরেও মৃত্যু আসবে, তখন তিনি অবিলম্বে মৃত্যুকে বেছে নিলেন। এটি আমাদের শেখায়:

দুনিয়ার জীবন যত দীর্ঘই হোক না কেন, এর শেষ আছে। দুনিয়ার জীবন আখিরাতের তুলনায় অতি নগণ্য। কুরআনে বলা হয়েছে:

"তাদের কাছে যেন দুনিয়ার জীবনে তারা মাত্র একটি দিনের কিছু সময় অবস্থান করেছিল।"

(সূরা আল-আহকাফ: ৩৫)

৩.৪ আখিরাতের প্রতি আগ্রহ

মুসা (আঃ) এর সিদ্ধান্ত থেকে আমরা বুঝতে পারি যে প্রকৃত মুমিন আখিরাতকে দুনিয়ার চেয়ে বেশি ভালোবাসে। তিনি জানতেন যে:

  • দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী
  • আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী
  • আল্লাহর সান্নিধ্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার
  • জান্নাতের নিয়ামত অসীম

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

"দুনিয়া হলো মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।"

(সহীহ মুসলিম: ২৯৫৬) - হাদীস দেখুন

৩.৫ তাওবা ও প্রস্তুতির গুরুত্ব

এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মৃত্যু যেকোনো সময় আসতে পারে। তাই আমাদের উচিত:

১. নিয়মিত তাওবা করা - গুনাহ থেকে ফিরে আসা ২. নেক আমল বৃদ্ধি করা - সালাত, যাকাত, সদকা, কুরআন তিলাওয়াত ৩. মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা - যেকোনো সময় মৃত্যু আসতে পারে ৪. পরকালীন সঞ্চয় করা - দুনিয়ার সম্পদ আখিরাতে কাজে আসবে না

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

"বুদ্ধিমান সে ব্যক্তি যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মৃত্যুর পরের জন্য আমল করে।"

(তিরমিযী: ২৪৫৯) - হাদীস দেখুন

৩.৬ আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল

মুসা (আঃ) মৃত্যুকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। তিনি জানতেন:

  • আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন
  • আল্লাহর পরিকল্পনা সর্বোত্তম
  • মৃত্যু আসলে ভয় নয়, বরং আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের মাধ্যম

কুরআনে বলা হয়েছে:

"যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়। জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।"

(সূরা আর-রা'দ: ২৮) - আয়াত দেখুন

৪. আলেমদের দৃষ্টিতে এই ঘটনা

৪.১ ইমাম নববী (রহ.) এর ব্যাখ্যা

বিখ্যাত হাদীস ব্যাখ্যাকারী ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন:

"এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে নবীগণ সাধারণ মানুষের মতো নন। তাঁদের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে এবং আল্লাহ তাঁদের সাথে বিশেষ আচরণ করেন। মুসা (আঃ) এর আঘাত করা ছিল তাঁর না জানার কারণে, এবং এটি তাঁর মর্যাদা হ্রাস করে না।"

৪.২ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) এর মতামত

"ফাতহুল বারী" গ্রন্থে ইবনে হাজার (রহ.) উল্লেখ করেছেন:

"মুসা (আঃ) যখন মৃত্যুদূতকে আঘাত করলেন, তখন তিনি জানতেন না যে তিনি ফেরেশতা। যদি জানতেন তাহলে কখনো আঘাত করতেন না। এটি আত্মরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া ছিল যা শরীয়তে জায়েয।"

৪.৩ ইবনে কাসীর (রহ.) এর ব্যাখ্যা

"আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া" তে ইবনে কাসীর (রহ.) বলেছেন:

"এই ঘটনা মুসা (আঃ) এর শক্তি ও সাহসিকতার প্রমাণ। একই সাথে এটি প্রমাণ করে যে তিনি জীবনের প্রতি আগ্রহী ছিলেন যাতে আরো বেশি ইবাদত করতে পারেন। কিন্তু যখন বুঝলেন মৃত্যু অবধারিত, তখন বিলম্ব না করে তা মেনে নিলেন।"

৫. ভুল ধারণা ও তার সংশোধন

ভুল ধারণা ১: মুসা (আঃ) মৃত্যুকে ভয় পেয়েছিলেন

সংশোধন: না, মুসা (আঃ) মৃত্যুকে ভয় পাননি। তিনি শুধু জানতেন না যে আগন্তুক ফেরেশতা এবং কী উদ্দেশ্যে এসেছেন। নবীগণ মৃত্যুকে ভয় পান না বরং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য আগ্রহী থাকেন।

ভুল ধারণা ২: এটি মুসা (আঃ) এর ভুল ছিল

সংশোধন: এটি কোনো ভুল ছিল না। বরং এটি স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া যা শরীয়ত সমর্থন করে। অনুমতি ছাড়া ঘরে প্রবেশকারীকে বাধা দেওয়া বৈধ।

ভুল ধারণা ৩: মালাকুল মউত দুর্বল

সংশোধন: মালাকুল মউত অত্যন্ত শক্তিশালী ফেরেশতা। তবে তিনি যে মানবীয় আকৃতি ধারণ করেছিলেন, সেই আকৃতিতে প্রভাব পড়েছিল। প্রকৃতপক্ষে ফেরেশতাদের ক্ষতি হয় না।

ভুল ধারণা ৪: মুসা (আঃ) আরো বাঁচতে চেয়েছিলেন

সংশোধন: মুসা (আঃ) দুনিয়াতে বাঁচার জন্য আগ্রহী ছিলেন না। বরং তিনি যখন জানলেন শেষ পরিণতি মৃত্যু, তখন অবিলম্বে মৃত্যুকে বেছে নিলেন।

৬. এই ঘটনা থেকে আমাদের করণীয়

৬.১ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি

আমাদের উচিত সবসময় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা। এর জন্য:

১. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নিয়মিত আদায় করা ২. প্রতিদিন ইস্তিগফার ও তাওবা করা ৩. কুরআন তিলাওয়াত ও অধ্যয়ন করা ৪. পিতা-মাতা ও আত্মীয়দের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখা ৫. অন্যায় ও গুনাহ থেকে বিরত থাকা ৬. সদকা ও দান করা ৭. মানুষের উপকার করা

৬.২ দুনিয়ার প্রতি মোহ কমানো

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

"তোমরা দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন মুসাফির বা পথচারী।"

(সহীহ বুখারী: ৬৪১৬) - হাদীস দেখুন

আমাদের মনে রাখতে হবে:

  • দুনিয়া স্থায়ী নয়
  • সম্পদ সাথে যাবে না
  • একমাত্র আমল সাথে যাবে

৬.৩ আখিরাতের জন্য সঞ্চয়

কুরআনে আল্লাহ বলেন:

"আর তোমরা যা কিছু নিজেদের জন্য আগে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে। তা উত্তম এবং পুরস্কার হিসেবে মহান।"

(সূরা আল-মুযযাম্মিল: ২০) - আয়াত দেখুন

আখিরাতের সঞ্চয়:

  • নেক আমল
  • ইলম শিক্ষা দেওয়া
  • সদকায়ে জারিয়া
  • সন্তান যারা দোয়া করবে
  • ইসলামের জন্য কাজ করা

৬.৪ মৃত্যুকে স্মরণ করা

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

"তোমরা বেশি বেশি সব আনন্দ বিনষ্টকারী বস্তুকে (মৃত্যু) স্মরণ করো।"

(তিরমিযী: ২৩০৭, ইবনে মাজাহ: ৪২৫৮) - হাদীস দেখুন

মৃত্যু স্মরণের উপকারিতা:

  • গুনাহ থেকে বিরত থাকা
  • দুনিয়ার মোহ কমে যায়
  • আখিরাতের চিন্তা বাড়ে
  • নেক আমলের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়

৭. সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ঘটনা

৭.১ মুসা (আঃ) ও খিযির (আঃ)

মুসা (আঃ) এর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো খিযির (আঃ) এর সাথে তাঁর সফর। এই ঘটনা থেকেও আমরা অনেক শিক্ষা পাই যে আল্লাহর কিছু হিকমত মানুষের বোধগম্যতার বাইরে।

(সূরা আল-কাহফ: ৬০-৮২)

৭.২ মুসা (আঃ) ও তূর পাহাড়

যখন মুসা (আঃ) আল্লাহর দর্শন চাইলেন, আল্লাহ তাঁকে পাহাড়ের দিকে তাকাতে বললেন। যখন তূর পাহাড়ে আল্লাহর নূরের তাজাল্লি পড়লো, পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল এবং মুসা (আঃ) বেহুঁশ হয়ে পড়লেন।

এই ঘটনা আল্লাহর মহত্ত্ব ও বান্দার অক্ষমতা প্রমাণ করে।

(সূরা আল-আ'রাফ: ১৪৩)

৮. উপসংহার

হযরত মুসা (আঃ) এবং মালাকুল মউতের এই ঘটনা আমাদের জন্য অসংখ্য শিক্ষা বহন করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়:

মৃত্যু অবধারিত - কেউ এড়াতে পারবে না ✓ দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী - যত দীর্ঘই হোক ✓ আখিরাতের প্রস্তুতি জরুরি - এখনই শুরু করতে হবে ✓ নবীগণের মর্যাদা বিশেষ - কিন্তু তাঁরাও মৃত্যুবরণ করেন ✓ আল্লাহর ফয়সালা মেনে নেওয়া - মুমিনের বৈশিষ্ট্য

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে এই ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার এবং মৃত্যুর আগেই নেক আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

"হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে দুনিয়ায়ও কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।"

(সূরা আল-বাকারা: ২০১) - আয়াত দেখুন


প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

১. মুসা (আঃ) কেন মৃত্যুদূতকে আঘাত করেছিলেন?

উত্তর: মুসা (আঃ) প্রথমে জানতেন না যে আগন্তুক মৃত্যুদূত। তিনি তাঁকে একজন অনুমতি ছাড়া ঘরে প্রবেশকারী মনে করে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে আঘাত করেছিলেন। এটি কোনো অপরাধ বা ভুল ছিল না।

২. এই হাদীসটি কি সহীহ?

উত্তর: হ্যাঁ, এই হাদীসটি সহীহ বুখারী (১৩৩৯) এবং সহীহ মুসলিম (২৩৭২) উভয় গ্রন্থেই বর্ণিত হয়েছে। এর সত্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

৩. ফেরেশতাদের কি ক্ষতি হয়?

উত্তর: ফেরেশতাগণ নূরের তৈরি এবং তাঁদের প্রকৃত ক্ষতি হয় না। তবে তাঁরা যখন কোনো আকৃতি ধারণ করেন, তখন সেই আকৃতিতে প্রভাব পড়তে পারে। মুসা (আঃ) এর আঘাতে মালাকুল মউতের চোখের ক্ষতি হয়েছিল কারণ তিনি মানুষের আকৃতিতে এসেছিলেন।

৪. মুসা (আঃ) কেন হাজার বছরের জীবন প্রত্যাখ্যান করলেন?

উত্তর: কারণ তিনি জানতেন যে শেষ পরিণতি মৃত্যু। হাজার বছর পরে হলেও তাঁকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে। তাই তিনি বিলম্ব না করে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করতে চেয়েছিলেন।

৫. মুসা (আঃ) কোথায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন?

উত্তর: মুসা (আঃ) বাইতুল মাকদিসের নিকটবর্তী স্থানে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন যে তাঁর কবর রাস্তার পাশে একটি লাল টিলার কাছে অবস্থিত।

৬. এই ঘটনা থেকে আমাদের কী শিক্ষা?

উত্তর: প্রধান শিক্ষা হলো:

  • মৃত্যু অবধারিত ও এড়ানো যায় না
  • দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী
  • আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি
  • আল্লাহর ফয়সালা মেনে নেওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য

৭. নবীগণ কি মৃত্যুকে ভয় পান?

উত্তর: না, নবীগণ মৃত্যুকে ভয় পান না। বরং তাঁরা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য আগ্রহী থাকেন। মুসা (আঃ) এর ঘটনা এর প্রমাণ যেখানে তিনি হাজার বছরের জীবনের চেয়ে অবিলম্বে মৃত্যুকে বেছে নিয়েছিলেন।

৮. মৃত্যুর জন্য আমরা কীভাবে প্রস্তুত হবো?

উত্তর: মৃত্যুর প্রস্তুতির জন্য:

  • নিয়মিত সালাত আদায় করুন
  • প্রতিদিন তাওবা ও ইস্তিগফার করুন
  • কুরআন তিলাওয়াত করুন
  • গুনাহ থেকে বিরত থাকুন
  • নেক আমল বৃদ্ধি করুন
  • সদকা করুন
  • মানুষের উপকার করুন

৯. মালাকুল মউত কে?

উত্তর: মালাকুল মউত হলেন মৃত্যুর ফেরেশতা যাঁকে আযরাঈল (আঃ) নামেও ডাকা হয়। আল্লাহ তাঁকে সকল প্রাণীর রূহ কবজ করার দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আল্লাহর আদেশ পালনকারী ফেরেশতা।

১০. এই ঘটনা কি সব মুসলমানদের বিশ্বাস করা উচিত?

উত্তর: হ্যাঁ, যেহেতু এটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তাই সব মুসলমানদের এই ঘটনার সত্যতায় বিশ্বাস করা উচিত। এটি আমাদের ঈমানের অংশ যে আমরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যা বলেছেন তা সত্য বলে মেনে নিই।

লেখক নোট: এই আর্টিকেলটি সহীহ হাদীস ও নির্ভরযোগ্য ইসলামী সূত্রের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। যেকোনো ভুল-ত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

শেয়ার করুন: এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আপনার বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সাথে শেয়ার করুন যাতে সবাই উপকৃত হতে পারে।

কমেন্ট করুন: এই ঘটনা সম্পর্কে আপনার মতামত বা প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট করুন।


Previous
Next Post »

Please do not enter any spam link in the comment box. ConversionConversion EmoticonEmoticon