নবী মূসা (আ.)–এর শেষ মুহূর্ত ও শিক্ষণীয় জীবনকথা

 


নবী_মূসা_(আ.)_এর_শেষ_মুহূর্ত_ও_শিক্ষণীয়_জীবনকথা

নবী মূসা (আ.)–এর শেষ মুহূর্ত ও শিক্ষণীয় জীবনকথা

একটি অনুপ্রেরণামূলক ইসলামী গল্প

ভূমিকা

নবী মূসা (আ.)—এই নামটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সংগ্রাম, সত্যের পক্ষে অবিচলতা, আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ তাওয়াক্কুল এবং নেতৃত্বের এক অনন্য আদর্শ। তিনি এমন এক নবী, যার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় মানবজাতির জন্য গভীর শিক্ষা বহন করে। ফেরাউনের দরবার থেকে শুরু করে লোহিত সাগর বিভক্ত হওয়া, তূর পাহাড়ে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলা এবং বনী ইসরাইলের কঠিন নেতৃত্ব—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল এক নিরবচ্ছিন্ন পরীক্ষা ও দায়িত্বের যাত্রা।

এই প্রবন্ধে আমরা বিশেষভাবে আলোচনা করব নবী মূসা (আ.)–এর শেষ মুহূর্ত, তাঁর ইন্তিকালের প্রেক্ষাপট এবং তাঁর সমগ্র জীবন থেকে প্রাপ্ত শিক্ষণীয় ও অনুপ্রেরণামূলক দিকগুলো, যা আজকের মুসলমানের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

নবী মূসা (আ.)–এর সংক্ষিপ্ত পরিচয়

নবী মূসা (আ.) ছিলেন বনী ইসরাইলের প্রতি প্রেরিত একজন মহান রাসূল। পবিত্র কুরআনে সর্বাধিকবার যে নবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি হলেন মূসা (আ.)। তাঁর জীবন ছিল অলৌকিক নিদর্শন, কঠিন পরীক্ষা ও ঐশী নির্দেশনার এক বিস্ময়কর সংমিশ্রণ।

মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • উলুল আযম নবীদের একজন

  • আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার মর্যাদা (কালিমুল্লাহ)

  • অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের বিরুদ্ধে সত্যের সংগ্রাম

  • তাওরাত প্রাপ্ত নবী

দীর্ঘ সংগ্রামের জীবন: শেষের পথে যাত্রা

বনী ইসরাইলকে ফেরাউনের দাসত্ব থেকে মুক্ত করার পরও নবী মূসা (আ.)–এর সংগ্রাম শেষ হয়নি। বরং মুক্তির পর শুরু হয় আরও কঠিন পরীক্ষা—একটি অবাধ্য, ভীত ও সংশয়গ্রস্ত জাতিকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করা।

মরুভূমিতে চল্লিশ বছরের ঘোরাফেরা, মান্না-সালওয়া প্রাপ্তি, স্বর্ণবাছুর পূজার মতো গর্হিত অপরাধ—সবকিছু ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন তিনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তাঁর দায়িত্ববোধ এক বিন্দুও কমেনি।

নবী মূসা (আ.)–এর শেষ মুহূর্তের ঘটনা

হাদিস ও তাফসির গ্রন্থসমূহে নবী মূসা (আ.)–এর ইন্তিকাল সম্পর্কে হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা পাওয়া যায়।

এক হাদিসে বর্ণিত আছে—
যখন মৃত্যুর ফেরেশতা হযরত মূসা (আ.)–এর কাছে আগমন করেন, তখন তিনি প্রথমে তা পছন্দ করেননি। এটি মানবিক অনুভূতিরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু যখন তাঁকে জানানো হলো যে আল্লাহ তাঁর জন্য নির্ধারিত সময় পূর্ণ করেছেন এবং তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যে যাবেন, তখন তিনি পূর্ণ সন্তুষ্টি ও আত্মসমর্পণের সঙ্গে আল্লাহর সিদ্ধান্ত মেনে নেন।

কানা‘আনের দ্বারপ্রান্তে ইন্তিকাল

আল্লাহর কাছে নবী মূসা (আ.) একটি দোয়া করেছিলেন—
তিনি যেন পবিত্র ভূমি (বায়তুল মুকাদ্দাস) থেকে খুব কাছাকাছি স্থানে ইন্তিকাল করেন।

আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেন। তিনি কানা‘আনের সন্নিকটে ইন্তিকাল করেন, যদিও বনী ইসরাইলের অবাধ্যতার কারণে তিনি নিজে সেই ভূমিতে প্রবেশ করতে পারেননি।

এখানেই লুকিয়ে আছে এক গভীর শিক্ষা—
নেতা সব সময় ফল ভোগ করেন না, কিন্তু পথ তৈরি করে দেন।

মৃত্যুর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি

নবী মূসা (আ.)–এর মৃত্যুভীতি ছিল না; ছিল দায়িত্ব শেষ না হওয়ার দুশ্চিন্তা। তিনি আল্লাহর সিদ্ধান্তের কাছে পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।

এটি আমাদের শেখায়—

  • মৃত্যু অবধারিত

  • প্রকৃত মুমিন মৃত্যুকে ভয় নয়, প্রস্তুতি হিসেবে গ্রহণ করে

  • আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্টিই ঈমানের পরিপূর্ণতা

নবী মূসা (আ.)–এর জীবন থেকে শিক্ষণীয় দিকসমূহ

১. সত্যের পথে আপসহীনতা

ফেরাউনের মতো অত্যাচারীর সামনে দাঁড়িয়ে সত্য ঘোষণা করা সহজ ছিল না। কিন্তু নবী মূসা (আ.) কখনো আপস করেননি।

২. ধৈর্য ও সহনশীলতা

বনী ইসরাইলের অবাধ্যতা সত্ত্বেও তিনি কখনো নেতৃত্ব ছেড়ে দেননি।

৩. তাওয়াক্কুল আলাল্লাহ

লোহিত সাগরের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন—
“কখনোই না, আমার রব আমার সঙ্গে আছেন।”

৪. জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব

খিদর (আ.)–এর সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রমাণ করে—নবী হয়েও তিনি জ্ঞান অর্জনে বিনয়ী ছিলেন।

৫. নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব, সুবিধা নয়

তিনি নিজে পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ না করলেও জাতিকে তার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন।

আজকের জীবনে প্রাসঙ্গিকতা

নবী মূসা (আ.)–এর জীবন আজকের মুসলমানের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক—

  • কর্মক্ষেত্রে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান

  • পরিবার ও সমাজে ধৈর্যশীল নেতৃত্ব

  • পরীক্ষায় পড়লে আল্লাহর ওপর ভরসা

  • ফলাফল নয়, দায়িত্ব পালনে মনোযোগ

উপসংহার

নবী মূসা (আ.)–এর শেষ মুহূর্ত আমাদের শেখায়—জীবনের সফলতা শুধু অর্জনে নয়, দায়িত্ব পালনের পর আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকার মধ্যেই প্রকৃত সফলতা। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রামের, কিন্তু শেষ ছিল আত্মসমর্পণের।

আজ আমরা যদি তাঁর জীবন থেকে সামান্য কিছু বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে আমাদের ব্যক্তিগত ও আখিরাতের জীবন আলোকিত হবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।

FAQ: প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (১০টি)

১. নবী মূসা (আ.) কোথায় ইন্তিকাল করেন?
কানা‘আনের নিকটবর্তী স্থানে।

২. তিনি কি বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করেছিলেন?
না, বনী ইসরাইলের অবাধ্যতার কারণে নয়।

৩. মৃত্যুর ফেরেশতার আগমনে তাঁর প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
মানবিক অনুভূতি প্রকাশ পেলেও পরে তিনি সন্তুষ্ট হন।

৪. তিনি কেন উলুল আযম নবী?
কারণ তিনি চরম পরীক্ষায় ধৈর্য ও দৃঢ়তা দেখিয়েছেন।

৫. তাঁর প্রধান মুজিজা কী ছিল?
আসা, লোহিত সাগর বিভক্ত হওয়া, তাওরাত প্রাপ্তি।

৬. খিদর (আ.)–এর সঙ্গে সাক্ষাতের শিক্ষা কী?
জ্ঞান সীমাহীন এবং বিনয় অপরিহার্য।

৭. তাঁর জীবন থেকে নেতৃত্বের কী শিক্ষা পাই?
নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব ও ত্যাগ।

৮. কেন তিনি আল্লাহর কাছে পবিত্র ভূমির নিকটে মৃত্যুর দোয়া করেন?
কারণ তিনি সেই ভূমিকে ভালোবাসতেন।

৯. আজকের জীবনে তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
তাওয়াক্কুল ও ধৈর্য।

১০. নবী মূসা (আ.)–এর জীবন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
কারণ এটি ঈমান, সংগ্রাম ও আত্মসমর্পণের পরিপূর্ণ মডেল।

Previous
Next Post »

Please do not enter any spam link in the comment box. ConversionConversion EmoticonEmoticon