জ্বীন ও মানুষের সম্পর্ক: ইবলিস থেকে নবী পর্যন্ত সত্য ঘটনা
ভূমিকা
আল্লাহ তায়ালা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে দুটি বুদ্ধিমান সৃষ্টি করেছেন - মানুষ এবং জ্বীন। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে, আর জ্বীনকে সৃষ্টি করা হয়েছে ধোঁয়াবিহীন আগুন থেকে। এই দুই সৃষ্টির মধ্যে সম্পর্ক, সংঘর্ষ এবং সহাবস্থানের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন এবং রহস্যময়। পবিত্র কুরআন এবং হাদিসে জ্বীন জাতি সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে যা আমাদের এই অদৃশ্য জগতের বাসিন্দাদের সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেয়।
জ্বীন কারা? কুরআনিক দৃষ্টিকোণ
জ্বীনের সৃষ্টি
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন, "আর জ্বীনকে সৃষ্টি করেছি ধোঁয়াবিহীন অগ্নিশিখা থেকে" (সূরা আর-রহমান: ১৫)। জ্বীনদের এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে যে তারা সাধারণত মানুষের দৃষ্টির বাইরে থাকে। তাদের শারীরিক গঠন মানুষের মতো নয়, বরং তারা বিভিন্ন রূপ ধারণ করতে সক্ষম।
জ্বীনদের বৈশিষ্ট্য
জ্বীনদের বেশ কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
- রূপান্তরের ক্ষমতা: তারা বিভিন্ন প্রাণী বা মানুষের রূপ ধারণ করতে পারে
- দ্রুতগতি: অত্যন্ত দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারে
- অদৃশ্যতা: সাধারণত মানুষের চোখে দেখা যায় না
- দীর্ঘায়ু: মানুষের তুলনায় অনেক দীর্ঘ জীবন লাভ করে
- শক্তি: শারীরিক শক্তিতে মানুষের চেয়ে অধিক ক্ষমতাবান
ইবলিস: প্রথম অবাধ্য জ্বীন
আদম (আ.) এর সৃষ্টি এবং ইবলিসের অহংকার
মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই জ্বীন ও মানুষের সম্পর্কের জটিলতা দেখা যায়। যখন আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করলেন এবং ফেরেশতাদের আদেশ দিলেন তাঁকে সেজদা করতে, তখন ইবলিস ছিল ফেরেশতাদের সাথে। সে ছিল জ্বীন জাতির অন্তর্ভুক্ত কিন্তু তার ইবাদতের কারণে ফেরেশতাদের মর্যাদা লাভ করেছিল।
কুরআন শরীফে এসেছে, "আর স্মরণ করো, যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা করো, তখন ইবলিস ব্যতীত সবাই সিজদা করল। সে অস্বীকার করল এবং অহংকার করল। ফলে সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল" (সূরা আল-বাকারা: ৩৪)।
ইবলিসের প্রতিজ্ঞা
আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর ইবলিস প্রতিজ্ঞা করে যে সে কিয়ামত পর্যন্ত মানুষকে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করবে। সে বলল, "হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে যেহেতু পথভ্রষ্ট করলেন, আমিও পৃথিবীতে মানুষের জন্য পাপকে সুশোভিত করব এবং তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করব" (সূরা আল-হিজর: ৩৯)।
এই প্রতিজ্ঞার মাধ্যমে শুরু হয় মানুষ ও শয়তান (ইবলিস এবং তার অনুসারী জ্বীন) এর মধ্যে চিরন্তন সংগ্রাম।
নবী-রাসুলদের সাথে জ্বীনদের সাক্ষাৎ
হযরত সুলাইমান (আ.) এবং জ্বীন জাতি
হযরত সুলাইমান (আ.) কে আল্লাহ তায়ালা এমন এক রাজত্ব দান করেছিলেন যা পূর্বে বা পরে কাউকে দেওয়া হয়নি। তাঁর রাজত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল জ্বীন, মানুষ, পশু-পাখি এবং বাতাসের উপর নিয়ন্ত্রণ।
জ্বীনদের কাজ: সুলাইমান (আ.) এর অধীনে জ্বীনরা বিভিন্ন কঠিন কাজ সম্পাদন করত। তারা উচ্চ প্রাসাদ, ভাস্কর্য, বিশাল পাত্র এবং চুল্লি নির্মাণ করত। কুরআনে এসেছে, "তারা সুলাইমানের ইচ্ছানুযায়ী তৈরি করত দুর্গ, ভাস্কর্য, হাউজসদৃশ বৃহৎ পাত্র এবং চুল্লির উপর স্থাপিত বিশাল ডেগ" (সূরা সাবা: ১৩)।
বিলকিসের সিংহাসন: জ্বীনদের অলৌকিক ক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া যায় যখন একজন শক্তিশালী জ্বীন বলেছিল যে সে চোখের পলকে সাবার রানী বিলকিসের সিংহাসন নিয়ে আসতে পারবে।
হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এবং জ্বীনদের ইসলাম গ্রহণ
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর নবুওয়াতের সময় একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে যখন একদল জ্বীন তাঁর কাছে এসে কুরআন তেলাওয়াত শোনে এবং ইসলাম গ্রহণ করে।
জ্বীনদের প্রতিনিধিদল: নাখলা নামক স্থানে রাসুল (সা.) যখন ফজরের নামাজে কুরআন তেলাওয়াত করছিলেন, তখন একদল জ্বীন তা শ্রবণ করে। তারা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শুনে এবং তাদের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গিয়ে সতর্ক করে দেয়।
কুরআনে বলা হয়েছে, "বলো, আমার কাছে ওহী করা হয়েছে যে, জ্বীনদের একটি দল মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করেছে এবং বলেছে, নিশ্চয়ই আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করেছি, যা সত্যের দিকে পথ নির্দেশ করে" (সূরা আল-জিন: ১-২)।
সূরা আল-জিন: এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পবিত্র কুরআনে একটি পূর্ণ সূরা নাজিল হয় যার নাম "সূরা আল-জিন"। এই সূরায় জ্বীনদের ইসলাম গ্রহণ, তাদের বিশ্বাস এবং তাদের সমাজের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
জ্বীনদের প্রকারভেদ
জ্বীন সমাজ বিভিন্ন ধরনের সদস্য নিয়ে গঠিত:
১. মুসলিম জ্বীন
যেসব জ্বীন আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং ইসলামের বিধান মেনে চলে। তারা সৎকর্মশীল এবং মানুষের ক্ষতি করে না।
২. কাফের বা শয়তান জ্বীন
যারা ইবলিসের অনুসারী এবং মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য কাজ করে। এদের মধ্যে রয়েছে:
- মারিদ: অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিদ্রোহী জ্বীন
- ইফরিত: ক্ষমতাধর এবং প্রভাবশালী জ্বীন
- শয়তান: মানুষকে কুমন্ত্রণা দানকারী
৩. নিরপেক্ষ জ্বীন
যারা ভালো বা মন্দ কোনো পক্ষে স্পষ্টভাবে নেই।
জ্বীন ও মানুষের মধ্যে সম্পর্কের ধরণ
ইতিবাচক সম্পর্ক
ধর্মীয় সহযোগিতা: মুসলিম জ্বীনরা মানুষের সাথে আল্লাহর ইবাদতে শরীক হতে পারে। তারা মসজিদে নামাজ আদায় করে এবং ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ করে।
সাহায্য সহযোগিতা: কিছু ক্ষেত্রে সৎ জ্বীনরা মানুষকে সাহায্য করতে পারে, তবে এটি সাধারণ নিয়ম নয়। নবী-রাসুলদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটেছে।
নেতিবাচক সম্পর্ক
কুমন্ত্রণা: শয়তান জ্বীনরা মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেয় পাপকাজের দিকে ধাবিত করতে। কুরআনে বলা হয়েছে, "আমি আশ্রয় চাই মানুষের প্রতিপালকের কাছে, মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দানকারী থেকে" (সূরা আন-নাস)।
ভয় দেখানো: দুর্বল ঈমানের মানুষদের ভয় দেখিয়ে তাদের বিভ্রান্ত করা।
প্রতারণা: বিভিন্ন রূপ ধারণ করে মানুষকে প্রতারিত করা।
জাদু-টোনা: কিছু শয়তান জ্বীন জাদুকরদের সাথে সহযোগিতা করে মানুষের ক্ষতি করে।
জ্বীন সম্পর্কিত ভ্রান্ত ধারণা
আমাদের সমাজে জ্বীন সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে:
ভ্রান্ত ধারণা ১: জ্বীনরা ভবিষ্যত জানে
সত্য: জ্বীনরা ভবিষ্যত জানে না। তারা কখনো কখনো আকাশের খবর চুরি করার চেষ্টা করে কিন্তু ফেরেশতাদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়। রাসুল (সা.) এর আগমনের পর এই পথও বন্ধ হয়ে যায়।
ভ্রান্ত ধারণা ২: জ্বীন মানুষের উপকার করতে পারে
সত্য: কাফের জ্বীনরা কখনো মানুষের প্রকৃত উপকার করে না। তারা ছোট ছোট সাহায্যের মাধ্যমে মানুষকে শিরক ও কুফরের দিকে নিয়ে যায়।
ভ্রান্ত ধারণা ৩: জ্বীনদের পূজা করা বৈধ
সত্য: জ্বীনদের পূজা করা, তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া, তাদের খুশি করার জন্য মানত করা - সবকিছুই শিরক এবং সম্পূর্ণ হারাম।
জ্বীন থেকে সুরক্ষার উপায়
ইসলাম আমাদের জ্বীনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কিছু কার্যকর উপায় শিখিয়েছে:
১. আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা
শক্তিশালী ঈমান এবং আল্লাহর উপর নির্ভরতা সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
২. নিয়মিত যিকির ও দোয়া
আয়াতুল কুরসি: প্রতিদিন বিশেষত রাতে ঘুমানোর আগে পড়া।
সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস: এই তিন সূরা নিয়মিত পাঠ করা।
বিসমিল্লাহ: প্রতিটি কাজ শুরুর আগে বিসমিল্লাহ বলা।
৩. পবিত্রতা বজায় রাখা
নিয়মিত অজু করা এবং পবিত্র থাকা শয়তানের প্রভাব থেকে রক্ষা করে।
৪. নামাজ ও কুরআন তেলাওয়াত
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত শয়তানকে দূরে রাখে।
৫. নৈতিক জীবনযাপন
পাপ থেকে বিরত থাকা এবং সৎকর্মে মনোনিবেশ করা শয়তানের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়।
জ্বীন সংক্রান্ত হাদিস
রাসুলুল্লাহ (সা.) জ্বীন সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ হাদিস বর্ণনা করেছেন:
হাদিস ১: আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, "প্রত্যেক মানুষের সাথে একজন শয়তান নিযুক্ত করা হয়েছে।" সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার সাথেও?" তিনি বললেন, "হ্যাঁ, তবে আল্লাহ আমাকে তার বিরুদ্ধে সাহায্য করেছেন এবং সে মুসলমান হয়ে গেছে, তাই সে আমাকে কেবল ভালো কাজের আদেশ দেয়।" (সহীহ মুসলিম)
হাদিস ২: জাবের (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, "রাতে যখন অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে তখন তোমরা তোমাদের শিশুদের ঘরে রাখো, কারণ সেই সময় শয়তানরা ছড়িয়ে পড়ে।" (সহীহ বুখারী)
হাদিস ৩: আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, "মদীনায় জ্বীনদের একটি দল মুসলমান হয়েছে। তাই যদি তোমরা এদের কাউকে দেখতে পাও, তিনবার তাদের সতর্ক করবে। যদি তারপরও তারা উপস্থিত হয়, তাহলে তাকে হত্যা করো কারণ সে শয়তান।" (সহীহ মুসলিম)
জ্বীন ও আধুনিক বিজ্ঞান
আধুনিক বিজ্ঞানীরা জ্বীনের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিভিন্ন মত পোষণ করেন। যদিও বিজ্ঞান এখনো জ্বীনদের সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারেনি, তবে কিছু বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব অদৃশ্য জীবের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয় না।
শক্তি ও পদার্থ
জ্বীনরা যেহেতু আগুন থেকে সৃষ্টি, তারা সম্ভবত এমন এক ধরনের শক্তি বা পদার্থ নিয়ে গঠিত যা আমাদের সাধারণ ইন্দ্রিয় দিয়ে ধরা পড়ে না। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান বিভিন্ন ধরনের অদৃশ্য তরঙ্গ এবং শক্তির অস্তিত্ব স্বীকার করে।
সমান্তরাল জগত
কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন যে আমাদের চারপাশে সমান্তরাল মাত্রা বা জগত থাকতে পারে যা আমরা সাধারণত দেখতে পাই না। জ্বীনরা সম্ভবত এমন কোনো জগতে বসবাস করে।
জ্বীন সম্পর্কে সতর্কতা
জ্বীন বিষয়ে আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি রাখা উচিত:
অতিরিক্ত ভয় নয়
জ্বীনদের নিয়ে অতিরিক্ত ভয় পাওয়া বা তাদের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়। আল্লাহই সর্বশক্তিমান এবং তাঁর উপর নির্ভর করলে কোনো জ্বীন ক্ষতি করতে পারে না।
অস্বীকার নয়
একইসাথে জ্বীনদের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করাও ঠিক নয়, কারণ কুরআন ও হাদিসে তাদের উল্লেখ স্পষ্ট।
জ্বীনদের সাথে যোগাযোগ নিষিদ্ধ
ইচ্ছাকৃতভাবে জ্বীনদের সাথে যোগাযোগ করা, তাদের ডাকা, তাদের কাছ থেকে সাহায্য চাওয়া - এসবই ইসলামে নিষিদ্ধ এবং শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
জ্বীন ও জাদু-টোনা
জাদু ও জ্বীনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। জাদুকররা শয়তান জ্বীনদের সাথে চুক্তি করে এবং তাদের সহায়তায় জাদু-টোনা করে।
জাদু কীভাবে কাজ করে
জাদুকর শয়তান জ্বীনদের খুশি করার জন্য কুফরী কাজ করে এবং বিনিময়ে জ্বীনরা তাকে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা দেখায়। এটি সম্পূর্ণ হারাম এবং কবীরা গুনাহ।
জাদু থেকে সুরক্ষা
কুরআন তেলাওয়াত, বিশেষত সূরা বাকারা, আয়াতুল কুরসি এবং মুয়াওবিযাতাইন (সূরা ফালাক ও নাস) জাদু থেকে সুরক্ষা দেয়।
উপসংহার
জ্বীন ও মানুষের সম্পর্ক আল্লাহর সৃষ্টির এক বিস্ময়কর দিক। ইবলিসের অবাধ্যতা থেকে শুরু করে নবী-রাসুলদের সাথে জ্বীনদের সাক্ষাত - এই পুরো ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে আল্লাহর হুকুম মান্য করা এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বীনরা আমাদের মতোই আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাদের মধ্যেও ভালো-মন্দ রয়েছে। আমাদের দায়িত্ব হলো কুরআন ও হাদিসের আলোকে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে নিজেদের রক্ষা করা। আল্লাহর উপর পূর্ণ ঈমান, নিয়মিত ইবাদত এবং নৈতিক জীবনযাপন আমাদের সকল অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারে।
FAQ - প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. জ্বীন কি সত্যিই আছে?
হ্যাঁ, পবিত্র কুরআন এবং সহীহ হাদিসে জ্বীনদের অস্তিত্বের স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তারা আগুন থেকে সৃষ্ট এক ধরনের প্রাণী যারা সাধারণত মানুষের চোখে দেখা যায় না। কুরআনে "সূরা আল-জিন" নামে একটি পূর্ণ সূরা রয়েছে যা জ্বীন সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করে।
২. জ্বীন কি মানুষকে ক্ষতি করতে পারে?
শয়তান জ্বীনরা মানুষকে কুমন্ত্রণা দিতে পারে এবং পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে। তবে দৃঢ় ঈমানদার ব্যক্তির উপর তাদের কোনো প্রকৃত ক্ষমতা নেই। নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত, দোয়া এবং আল্লাহর যিকির জ্বীনদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করে।
৩. জ্বীনদের কি ইসলাম আছে?
হ্যাঁ, জ্বীনদের মধ্যেও মুসলিম এবং কাফের উভয়ই রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সময় একদল জ্বীন ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাদের উপরও ইবাদত ফরজ এবং তারা মানুষের মতোই কিয়ামতের দিন হিসাবের সম্মুখীন হবে।
৪. জ্বীন কি ভবিষ্যত বলতে পারে?
না, জ্বীনরা ভবিষ্যত জানে না। তারা কখনো কখনো আকাশের খবর চুরি করার চেষ্টা করতো, কিন্তু রাসুল (সা.) এর আগমনের পর সেই পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। যারা জ্বীনের মাধ্যমে ভবিষ্যত বলার দাবি করে তারা মিথ্যাবাদী।
৫. জ্বীনদের কাছ থেকে সাহায্য চাওয়া কি জায়েজ?
না, জ্বীনদের কাছে সাহায্য চাওয়া, তাদের পূজা করা বা তাদের খুশি করার জন্য কিছু করা সম্পূর্ণ হারাম এবং শিরক। কেবলমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে।
৬. জ্বীন থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো উপায় কী?
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত, আয়াতুল কুরসি পাঠ, সকাল-সন্ধ্যার দোয়া এবং পবিত্র জীবনযাপন জ্বীনদের অনিষ্ট থেকে সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখা।
৭. জ্বীন কি বিয়ে করতে পারে?
হ্যাঁ, জ্বীনরা তাদের নিজেদের মধ্যে বিয়ে করে এবং তাদের সন্তান হয়। তাদের পারিবারিক এবং সামাজিক জীবন রয়েছে। কিন্তু জ্বীন এবং মানুষের মধ্যে বিয়ে ইসলামী শরীয়তে নিষিদ্ধ এবং কোনো ফকীহ এটি বৈধ বলেন নি।
৮. সুলাইমান (আ.) কীভাবে জ্বীনদের নিয়ন্ত্রণ করতেন?
আল্লাহ তায়ালা হযরত সুলাইমান (আ.) কে বিশেষ ক্ষমতা দান করেছিলেন যার মাধ্যমে তিনি জ্বীন, মানুষ, পশু-পাখি এবং বাতাসের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতেন। এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ মু'জিজা এবং সাধারণ মানুষের জন্য এই ক্ষমতা নেই।
৯. ঘরে জ্বীন থাকার লক্ষণ কী?
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে জ্বীন সম্পর্কে অতিরিক্ত চিন্তা করা উচিত নয়। তবে যদি কেউ মনে করেন জ্বীনের উপস্থিতি আছে, তাহলে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ঘরে নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করা, আযান দেওয়া এবং পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র রাখা।
১০. জাদু-টোনা কি সত্যি?
হ্যাঁ, জাদু বাস্তব এবং কুরআনে এর উল্লেখ আছে। তবে জাদু কেবল আল্লাহর অনুমতিতেই কাজ করতে পারে। জাদুকররা শয়তান জ্বীনদের সাথে চুক্তি করে কুফরী কাজের মাধ্যমে জাদু করে। জাদু করা এবং করানো উভয়ই কবীরা গুনাহ এবং হারাম।
- ইসলামে জাদু-টোনা: বাস্তবতা ও প্রতিকার
- আয়াতুল কুরসির ফজিলত ও উপকারিতা
- সূরা ফালাক ও নাস: শয়তান থেকে আশ্রয়
- নবী সুলাইমান (আ.) এর জীবনী
- রাসুল (সা.) এর জীবনে অলৌকিক ঘটনা
- কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান
- ইসলামে পরকালের বিশ্বাস
- শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার উপায়
- ইসলামিক দোয়া সংগ্রহ
- নামাজের ফজিলত ও গুরুত্ব
- Quran.com - সূরা আল-জিন
- Quran.com - সূরা আর-রহমান
- Sunnah.com - জ্বীন সম্পর্কিত হাদিস
- IslamQA - জ্বীন সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
- IslamQA - জাদু ও জ্বীন
- Hadith Collection - Sahih Bukhari
- Hadith Collection - Sahih Muslim
- Bayyinah Institute - ইসলামিক শিক্ষা
- SeekersGuidance - ইসলামিক নলেজ
- Yaqeen Institute - রিসার্চ পেপার
লেখক নোট: এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মৌলিক এবং কুরআন ও হাদিসের আলোকে লেখা হয়েছে। কোনো কপি-পেস্ট নেই।

Please do not enter any spam link in the comment box. ConversionConversion EmoticonEmoticon