মূর্তি তৈরির শুরু থেকে ভ্রান্তির পথে: একটি শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা

মূর্তি_তৈরির_শুরু_থেকে_ভ্রান্তির_পথে

 


মূর্তি তৈরির শুরু থেকে ভ্রান্তির পথে — শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা
📖 ইসলামিক শিক্ষামূলক নিবন্ধ

মূর্তি তৈরির শুরু থেকে ভ্রান্তির পথে
শিক্ষণীয় ইসলামিক ঘটনা

কুরআন, হাদিস ও ইতিহাসের আলোকে মূর্তিপূজার উৎপত্তি, শিরকের বিস্তার এবং তাওহিদের অপরিহার্যতা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ

📅 সর্বশেষ আপডেট: ২০২৬ ⏱ পড়ার সময়: প্রায় ১২–১৫ মিনিট 📚 বিভাগ: আকিদা ও তাওহিদ

১. ভূমিকা: শিরক কেন সবচেয়ে বড় পাপ?

ইসলামের মূল ভিত্তি হলো তাওহিদ — এক আল্লাহর একত্ব। যে বিশ্বাস থেকে সরে গিয়ে মানুষ মূর্তিপূজায় নিমজ্জিত হয়, সেই শিরককে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সর্বপ্রথম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ পাপ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এই পাপ এতটাই মারাত্মক যে, আল্লাহ ঘোষণা করেছেন তিনি শিরক ছাড়া যেকোনো পাপ ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু শিরকের ক্ষমা নেই — যদি না মানুষ তওবা করে তাওহিদে ফিরে আসে।

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না; তবে এর চেয়ে ছোট যেকোনো পাপ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।"
📖 সূরা আন-নিসা: ৪৮

প্রশ্ন হলো — মানুষ এই ভয়াবহ পথে কীভাবে পা বাড়াল? মূর্তিপূজা কি হঠাৎ শুরু হয়েছিল, নাকি এর পেছনে একটি ক্রমশ পতনের ইতিহাস আছে? এই নিবন্ধে আমরা সেই ইতিহাস অন্বেষণ করব — কুরআনের আলো, নবীদের জীবন এবং ইসলামী স্কলারদের বিশ্লেষণের সাথে।

✦ ✦ ✦

২. মূর্তিপূজার উৎপত্তি — ইতিহাসের শুরু

ইসলামী ইতিহাস ও আলেমদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পৃথিবীতে মূর্তিপূজার উৎপত্তি একটি নিরীহ অনুভূতি থেকে — প্রিয়জনের স্মৃতি ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা। এটি শুরু হয়েছিল ভালোবাসা থেকে, কিন্তু ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল ভ্রান্তিতে।

প্রথম মূর্তির জন্ম: ভালোবাসার বিকৃতি

ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত তাফসিরে আসে যে, নূহ (আ.)-এর কওমের মধ্যে এমন কিছু নেককার মানুষ ছিলেন — ওয়াদ্দ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক এবং নাসর — যাদেরকে তাদের সময়ের মানুষেরা অত্যন্ত সম্মান করত। যখন তারা মারা গেলেন, শোকার্ত মানুষেরা তাদের স্মৃতি ধরে রাখতে তাদের ছবি ও মূর্তি তৈরি করল।

প্রথমে উদ্দেশ্য ছিল স্মৃতিচারণ — "এই মহান মানুষটির কথা মনে রাখব।" কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে গেল। শয়তান মানুষের মনে ঢুকিয়ে দিল — "তোমাদের পূর্বপুরুষরা এদের পূজা করত।" এভাবেই শুরু হলো পূজার ধারা।

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: "নূহ (আ.)-এর কওমের মধ্যে ওয়াদ্দ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নাসর ছিলেন নেককার মানুষ। তাদের মৃত্যুর পর শয়তান তাদের সম্প্রদায়ের কাছে এই মত ঢুকিয়ে দিল যে, তাদের মূর্তি বানাও এবং সভাস্থলে রাখো, যেন তাদের দেখলে ইবাদতে মনোযোগ বাড়ে। তারা তা করল। প্রথম প্রজন্ম মূর্তির পূজা করেনি, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম করল।"

📚 সহিহ বুখারি, কিতাবুত তাফসির (সূরা নূহের তাফসির)

এখানে একটি গভীর শিক্ষা আছে: শয়তান সরাসরি মানুষকে পূজায় ডাকে না। সে ধাপে ধাপে এগোয় — প্রথমে ভালো কিছুকে অজুহাত বানায়, তারপর ধীরে ধীরে বিচ্যুতি ঘটায়।

⚠️ সতর্কতামূলক শিক্ষা

ভালো নিয়তে শুরু করলেও যদি সেটা আল্লাহর নির্দেশের বাইরে যায়, তাহলে তা ধীরে ধীরে শিরকে পরিণত হতে পারে। এজন্যই ইসলামে কবর বা মাজারকে পূজার স্থান বানানো নিষিদ্ধ।

✦ ✦ ✦

৩. নূহ (আ.) এর কওম ও পাঁচ বিখ্যাত মূর্তির ঘটনা

কুরআনে সূরা নূহে আল্লাহ তায়ালা জানিয়েছেন যে, নূহ (আ.) ৯৫০ বছর তাঁর কওমকে তাওহিদের দাওয়াত দিয়েছেন। এত দীর্ঘ সংগ্রামের পরেও তাঁর কওম ঈমান আনেনি, বরং তাদের উপাস্য মূর্তিগুলোকে আঁকড়ে ধরেছিল।

وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا
"এবং তারা বলল: তোমরা কখনো তোমাদের দেবতাদের পরিত্যাগ করো না — না ওয়াদ্দকে, না সুওয়াকে, না ইয়াগুসকে, না ইয়াউককে এবং না নাসরকে।"
📖 সূরা নূহ: ২৩

পাঁচটি মূর্তির পরিচয়

  • ওয়াদ্দ (وَدّ): একজন নেককার ব্যক্তির নাম ছিল — পরে মূর্তি হিসেবে পূজা পায়। পুরুষাকৃতির মূর্তি।
  • সুওয়া (سُوَاع): নারীর আকৃতির মূর্তি।
  • ইয়াগুস (يَغُوث): সিংহের আকৃতি বিশিষ্ট বলা হয়।
  • ইয়াউক (يَعُوق): ঘোড়ার আকৃতির মূর্তি।
  • নাসর (نَسْر): ঈগলের আকৃতির মূর্তি।

এই মূর্তিগুলো কেবল নূহ (আ.)-এর সময়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি — পরবর্তীতে আরব ভূমিতেও এগুলোর পূজা প্রচলিত হয়েছিল। মহাপ্লাবনের পরে যখন মানবজাতি পুনরায় ছড়িয়ে পড়ল, শয়তান পুরনো মূর্তিগুলোর স্মৃতি মানুষের মনে আবার জাগিয়ে তুলল। এইভাবে ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হলো।

💡 শিক্ষণীয় বিষয়

নূহ (আ.) ৯৫০ বছর দাওয়াত দিয়েছেন, তবুও তাঁর কওম ঈমান আনেনি। এটি প্রমাণ করে যে, হেদায়েত আল্লাহর হাতে — তবে দাওয়াতের কাজ থামানো যাবে না।

✦ ✦ ✦

৪. ইব্রাহিম (আ.) এর অসাধারণ সংগ্রাম — একা একজন বনাম পুরো সমাজ

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সাহসী এবং শিক্ষণীয় মূর্তিবিরোধী সংগ্রাম হলো ইব্রাহিম (আ.)-এর ঘটনা। তিনি এমন একটি সমাজে জন্মেছিলেন যেখানে মূর্তি তৈরি এবং বিক্রি ছিল জীবিকা — এমনকি তাঁর নিজের বাবা আযর (বা তারিখ) ছিলেন মূর্তি নির্মাতা।

وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيهِ آزَرَ أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا آلِهَةً ۖ إِنِّي أَرَاكَ وَقَوْمَكَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ
"স্মরণ করো যখন ইব্রাহিম তার পিতা আযরকে বলেছিল: তুমি কি মূর্তিগুলোকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করছ? আমি নিশ্চয়ই তোমাকে এবং তোমার সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখছি।"
📖 সূরা আল-আনআম: ৭৪

কৌশলী যুক্তি দিয়ে সত্য প্রমাণ

ইব্রাহিম (আ.) শুধু বলেই থামেননি — তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে তাওহিদের সত্যতা এবং শিরকের অসারতা প্রমাণ করেছিলেন। একবার তিনি তারার দিকে তাকিয়ে বললেন, "এই আমার রব?" তারপর তারা ডুবে গেলে বললেন, "ডুবন্ত জিনিস আমি পছন্দ করি না।" চাঁদের ক্ষেত্রে, সূর্যের ক্ষেত্রে একই প্রশ্ন করলেন। এভাবে তিনি দেখালেন — যা অস্ত যায়, যা ওঠানামা করে, তা রব হতে পারে না।

মূর্তি ভাঙার সেই সাহসী ঘটনা

সূরা আল-আম্বিয়ায় বর্ণিত আছে: একটি উৎসবের দিনে যখন সবাই বাইরে চলে গেল, ইব্রাহিম (আ.) মন্দিরে প্রবেশ করলেন এবং মূর্তিগুলো ভেঙে ফেললেন। শুধু সবচেয়ে বড় মূর্তিটি রেখে দিলেন এবং কুঠারটি তার গলায় ঝুলিয়ে দিলেন।

যখন কওম ফিরে এলো এবং জিজ্ঞেস করল কে এটা করেছে, ইব্রাহিম (আ.) বললেন: "বড় মূর্তিটিই করেছে — ওকে জিজ্ঞেস করো।" কওম বলল, "মূর্তি কথা বলতে পারে না!" ইব্রাহিম (আ.) সাথে সাথে বললেন, "তাহলে তোমরা এমন জিনিসের পূজা করছ যে কথাও বলতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না — এই কি বুদ্ধিমানের কাজ?"

কওম নিরুত্তর হলো। তবু তারা হেদায়েত পেলো না — বরং ইব্রাহিমকে আগুনে পোড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল।

قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ
"আমি বললাম: হে আগুন! ইব্রাহিমের জন্য ঠান্ডা ও শান্তির কারণ হয়ে যাও।"
📖 সূরা আল-আম্বিয়া: ৬৯

আল্লাহ তাঁর বান্দাকে অলৌকিকভাবে রক্ষা করলেন। এটি আমাদের শেখায়: যে সত্যের পথে থাকে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।

✦ ✦ ✦

৫. আরবের কুরাইশ ও জাহেলিয়া যুগের শিরক

নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আগমনের পূর্বে আরবের সমাজ ছিল অন্ধকারে নিমজ্জিত — এই যুগকে ইসলামে "জাহেলিয়া যুগ" বলা হয়। তখন কাবা শরিফকে ঘিরে ছিল ৩৬০টিরও বেশি মূর্তি। একটি পবিত্র ঘর, যা ইব্রাহিম (আ.) নির্মাণ করেছিলেন একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের জন্য, তা পরিণত হয়েছিল মূর্তির আখড়ায়।

কীভাবে মূর্তি প্রবেশ পেল কাবায়?

আমর ইবনে লুহাই — মূর্তিপূজার আরব প্রবর্তক

ইতিহাসবিদ ও মুফাচ্ছিরদের মতে, আরবে মূর্তিপূজার সূচনা করেছিলেন আমর ইবনে লুহাই — খুযাআহ গোত্রের নেতা। তিনি সিরিয়া ভ্রমণে গিয়ে সেখানকার মানুষদের মূর্তিপূজা দেখে মুগ্ধ হলেন এবং "হুবাল" মূর্তি আরবে নিয়ে এলেন। ধীরে ধীরে পুরো আরব প্রায়দ্বীপে মূর্তিপূজা ছড়িয়ে পড়ল।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "আমি জাহান্নামে আমর ইবনে লুহাইকে দেখলাম, সে তার অন্ত্র টেনে নিয়ে চলছে — কারণ সে-ই প্রথম আরবদের মধ্যে মূর্তির রীতি চালু করেছিল।"

📚 সহিহ মুসলিম

এই হাদিসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে: যে ব্যক্তি একটি ভ্রান্ত রীতি চালু করে, সে শুধু নিজের পাপই বহন করে না — বরং পরবর্তী সকলের পাপেরও অংশীদার হয়। এই কারণেই রাসুল (সা.) বলেছেন, "যে কোনো খারাপ সুন্নত চালু করে, সে তার পাপ এবং যারা সেটা অনুসরণ করবে তাদের পাপও বহন করবে।"

✦ ✦ ✦

৬. মক্কা বিজয়: কাবার মূর্তি ধ্বংস — ঐতিহাসিক মুহূর্ত

৮ম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের দিনে ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে অর্থবহ মুহূর্তগুলোর একটি ঘটে। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কায় প্রবেশ করলেন এবং সরাসরি মসজিদুল হারামে গিয়ে তাওয়াফ করলেন। কাবার চারপাশে যে ৩৬০টি মূর্তি ছিল, তিনি একটি লাঠি দিয়ে সেগুলো ধাক্কা দিতে দিতে পড়লেন:

وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ ۚ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا
"এবং বলো: সত্য এসেছে, মিথ্যা বিদায় নিয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিনষ্ট হওয়ারই।"
📖 সূরা আল-ইসরা: ৮১

প্রতিটি মূর্তি উপুড় হয়ে পড়ে গেল। ইব্রাহিম (আ.) যে পবিত্র গৃহ তৈরি করেছিলেন, সেটি আবার মুক্ত হলো শিরকের শৃঙ্খল থেকে। এটি ছিল তাওহিদের চূড়ান্ত বিজয়।

💡 গভীর তাৎপর্য

মক্কা বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন — প্রতিশোধ নিলেন না। এটি প্রমাণ করে যে ইসলাম মানুষকে ভালোবাসে, শুধু শিরকের বিরুদ্ধে — মানুষের বিরুদ্ধে নয়।

✦ ✦ ✦

৭. মানুষ শিরকে পড়ার কারণগুলো — সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

মানুষ কেন শিরকে পা দেয়? শুধু ইচ্ছাকৃত বিচ্যুতি নয়, এর পেছনে গভীর সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং শয়তানি কারণ আছে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে কয়েকটি মূল কারণ আলোচনা করা হলো:

  • পূর্বপুরুষের অনুকরণ: কুরআনে বারবার এই কারণটির উল্লেখ আছে। মুশরিকরা বলত: "আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে এটাই করতে দেখেছি।" অন্ধ অনুকরণ মানুষকে সত্য থেকে দূরে রাখে।
  • আবেগী সংযুক্তি ও ভালোবাসার বিকৃতি: প্রিয় মানুষের স্মৃতি ধরে রাখতে গিয়ে মূর্তি তৈরি — তারপর সেই মূর্তিতে শ্রদ্ধা — তারপর পূজা। এই ধাপগুলো খুব ধীরে ঘটে।
  • শয়তানের ওয়াসওয়াসা: শয়তান প্রতিটি পদক্ষেপে মানুষকে বিচ্যুত করে। সে সরাসরি শিরকে ডাকে না — সুন্দর যুক্তি দিয়ে ভুল পথে নামায়।
  • ভয় ও আশার ভুল ব্যবস্থাপনা: মানুষ যা ভয় পায় বা যার কাছ থেকে উপকার আশা করে, তার দিকে ঝুঁকে পড়ে। সেই ভয় বা আশাকে যদি আল্লাহর দিকে না নিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে যায় — তখনই শিরক ঘটে।
  • সমাজের চাপ ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভুল: "সবাই করছে তাই সঠিক" — এই মানসিকতা সত্যের পথ থেকে সরিয়ে দেয়। ইব্রাহিম (আ.)-এর সময়ে পুরো সমাজ শিরকে ডুবে ছিল, তবুও তিনি একা সত্যে অটল ছিলেন।
  • জ্ঞানের অভাব ও তাওহিদ না জানা: সঠিক ইলম না থাকলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। এজন্যই আল্লাহ ৫,০০০ বার "আকল" সংক্রান্ত শব্দ কুরআনে ব্যবহার করেছেন — বোঝার, চিন্তা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
✦ ✦ ✦

৮. শিক্ষণীয় দিক ও আমাদের আজকের করণীয়

ইতিহাসের এই ঘটনাগুলো থেকে আমরা আধুনিক মুসলমান হিসেবে কী শিক্ষা নেব? শিরক শুধু পাথরের মূর্তিতে সীমাবদ্ধ নয় — আধুনিক যুগেও শিরকের অনেক সূক্ষ্ম রূপ আছে যা আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

⚠️ আধুনিক যুগের সূক্ষ্ম শিরক

শিরক শুধু মূর্তিপূজা নয়। রিয়া (লোক-দেখানো ইবাদত), অতিরিক্ত মাজার-নির্ভরতা, "ভাগ্য" বা "কর্মফল"-এর নামে আল্লাহকে বাদ দেওয়া — এগুলোও শিরকের কাছাকাছি বিষয়।

আমাদের করণীয়

  • তাওহিদের সঠিক জ্ঞান অর্জন: আল্লাহর নাম, গুণ এবং একত্বের ব্যাপারে সঠিক আকিদা শিক্ষা করা — এটি সবচেয়ে জরুরি ইলম।
  • সন্তানদের তাওহিদ শেখানো: ঘরে ইসলামিক পরিবেশ তৈরি করুন। প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত, নামাজ এবং আল্লাহর কথা আলোচনা করুন।
  • সন্দেহজনক কাজ এড়ানো: কোনো কবর, মাজার বা ব্যক্তিকে সেভাবে সম্মান না দেওয়া যা শুধু আল্লাহর জন্য প্রাপ্য।
  • দাওয়াতের কাজ: ইব্রাহিম (আ.) ও নূহ (আ.)-এর মতো ধৈর্য ধরে সত্যের দাওয়াত দিয়ে যাওয়া — হতাশ না হওয়া।
  • আল্লাহর কাছে হেদায়েত চাওয়া: প্রতিদিন সূরা ফাতেহায় আমরা বলি "ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম" — সঠিক পথে থাকার দোয়া।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের আগের মানুষদের কাছ থেকে এমন কিছু তোমাদের কাছে আসতে পারে যা তোমাদের পূর্বপুরুষের পথে নিয়ে যেতে পারে — শিরক থেকে সাবধান থেকো।"

📚 মুসনাদে আহমাদ (অর্থানুযায়ী)
✦ ✦ ✦
❓ সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
মূর্তিপূজা কি সব সময়ই পাপ ছিল, নাকি একসময় অনুমতি ছিল? +
ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, আদম (আ.) থেকে শুরু করে প্রতিটি যুগে আল্লাহ নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন তাওহিদের দাওয়াত দিতে। তাই মূর্তিপূজা কোনো যুগেই আল্লাহর অনুমোদিত ছিল না। তবে মানুষ বিচ্যুত হয়ে এটি শুরু করেছে এবং নবীরা বারবার তাদের সতর্ক করেছেন।
কবর জিয়ারত কি শিরক? মাজারে যাওয়া কি নিষেধ? +
কবর জিয়ারত ইসলামে জায়েয — বরং মৃত্যুর কথা স্মরণ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু কবর বা মাজারে গিয়ে দোয়া চাওয়া, মান্নত দেওয়া বা মৃত ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়া — এটি শিরক। দোয়া ও ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য।
ইব্রাহিম (আ.) কি সত্যিই মূর্তি ভেঙেছিলেন, এটা কি কুরআনে আছে? +
হ্যাঁ, এটি সূরা আল-আম্বিয়া (আয়াত ৫৭-৬৮) এবং সূরা আস-সাফফাত (আয়াত ৮৯-৯৬)-এ বিস্তারিত বর্ণিত আছে। এটি কুরআনের একটি স্পষ্ট ঘটনা যা আল্লাহ বর্ণনা করেছেন শিক্ষার উদ্দেশ্যে।
শিরক করলে কি তওবা হয়? নাকি ক্ষমা হবেই না? +
সূরা আন-নিসার ৪৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন শিরক ক্ষমা করবেন না — এটি মৃত্যুর পরের অবস্থার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর আগে যদি কেউ খাঁটি তওবা করে তাওহিদে ফিরে আসে, তাহলে আল্লাহ ক্ষমা করেন। সূরা আয-যুমার ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন: "আমার রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।"
নূহ (আ.)-এর ঘটনার পাঁচ মূর্তি কি পরে আরবেও পূজা পেয়েছিল? +
হ্যাঁ, ইবনে আব্বাস (রা.) ও তাফসিরকারদের বর্ণনা অনুযায়ী, মহাপ্লাবনের পরে শয়তান এই মূর্তিগুলোর স্মৃতি আবার জাগিয়ে তুলল এবং আরব গোত্রগুলোর মধ্যে এগুলোর পূজা ছড়িয়ে পড়ল। "ওয়াদ্দ" কালব গোত্র, "সুওয়া" হুযাইল গোত্র, "ইয়াগুস" মুরাদ গোত্র — এভাবে প্রতিটি মূর্তি ভিন্ন ভিন্ন গোত্রে পূজা পেত।
মূর্তি বানানো কি ইসলামে হারাম? শিল্পকলার ক্ষেত্রে কী বিধান? +
জীবের মূর্তি বা ভাস্কর্য তৈরি করা ইসলামে হারাম — এটি একাধিক সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন মূর্তি-নির্মাতাদের কঠিন শাস্তি হবে। তবে প্রাণহীন বস্তুর চিত্রকলা বা ছবি নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। পূজার উদ্দেশ্যে যেকোনো মূর্তি তৈরি বা কেনা-বেচা সম্পূর্ণ হারাম।
ইব্রাহিম (আ.)-এর বাবা কি মুশরিক ছিলেন? তাঁর পরিণতি কী হয়েছিল? +
হ্যাঁ, ইব্রাহিম (আ.)-এর পিতা আযর (কুরআনের নাম) ছিলেন মূর্তি নির্মাতা ও মূর্তিপূজক। ইব্রাহিম (আ.) বারবার তাঁকে দাওয়াত দিয়েছেন। তিনি ঈমান না এনে মারা গেছেন। এই কারণে ইব্রাহিম (আ.) প্রথমে তাঁর জন্য ক্ষমা চাইতেন, কিন্তু পরে আল্লাহ নিষেধ করার পর বিরত হয়েছেন — যা সূরা আত-তাওবার ১১৩-১১৪ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে।
রিয়া বা লোক-দেখানো ইবাদত কি শিরক? +
রিয়া বা লোক-দেখানো ইবাদতকে হাদিসে "ছোট শিরক" (শিরকে আসগার) বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "আমি তোমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি যা ভয় করি তা হলো ছোট শিরক।" সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, ছোট শিরক কী? তিনি বললেন: "রিয়া।" (মুসনাদে আহমাদ)। তাই খাঁটি নিয়তে ইবাদত করা অপরিহার্য।
Previous
Next Post »

Please do not enter any spam link in the comment box. ConversionConversion EmoticonEmoticon